জে. মাসুদসহ ১০০ এজেন্সির মামলা নিষ্পত্তির জন্য চিঠি

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে বেস্টিনেটের নতুন ‘টোপ’

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডি কোম্পানি তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘তুরাপ’ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে এবার সম্পূর্ণ বিনাখরচে কর্মী নিতে আগ্রহের কথা জানিয়ে লিখিত প্রস্তাব দিয়েছে মালয়েশিয়ান সরকারের কাছে। তুরাপ এর অর্থ হচ্ছে- ‘দ্য ইউনিভার্সল রিক্রুটমেন্ট আ্যডভান্সড প্ল্যাটফর্ম’। গ্লোবাল এমপ্লয়মেন্ট ফ্যাসিলিটেশন সেন্টারের (জিইএফসি) মাধ্যমে পুরো শ্রমবাজারটি পরিচালিত হবে বলেও তাদের প্রস্তাবিত ফর্মুলার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে মালয়েশিয়ার জনশক্তি ব্যবসার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা নয়া দিগন্তকে বলেন, বিনাখরচে মালয়েশিয়ায় কর্মী নেয়ার নতুন ফর্মুলাটি পুরনো সেই চিহ্নিত সিন্ডিকেটের প্রতারণামূলক কথা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের দাবি, এবার মালয়েশিয়ার সিন্ডিকেটের হোতা দাতো শ্রী আমিন নুর অন্য কোম্পানির নামে যে ফর্মুলায় কর্মী নেয়ার প্রস্তাব করেছে সেটিও মূলত ২০-২৫ জনের মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে কর্মী পাঠানোর ফর্মুলাই দিয়েছে। কারণ অতীতে মালয়েশিয়ায় কোনো দিনও বাংলাদেশ থেকে কোনো কর্মী ফ্রি যেতে পারেনি। এটা এক ধরনের ‘টোপ’ হতে পারে।

এ দিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট করে কর্মী পাঠানোর এ দেশীয় গডফাদার রহুল আমিন স্বপন, মো: নুর আলী ও ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম খলনায়ক লে. জে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ যে ১০০ রিক্রুটিং এজেন্সির সমন্বয়ে পৃথক দু’টি সিন্ডিকেট গঠন করা হয়েছিল, তাদের পক্ষ থেকেই চলতি মাসে বন্ধ শ্রমবাজার খোলা এবং মালয়েশিয়া সরকারের কাছে দেয়া ওয়াদা রক্ষার্থে দায়ের করা এজেন্সির নামে মিথ্যা-মামলা নিষ্পত্তিপূর্বক শ্রমবাজারটি পুনঃউন্মুক্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দফতরে লিখিত চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছে। চিঠির অনুলিপি দেয়া হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীকেও। গত ৩ মার্চ সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে দেয়া এই চিঠির একটি ড্রাফট করা কপি গতকাল নয়া দিগন্তের কাছে আসে। একই সাথে বেস্টিনেট কোম্পানির অন্য প্রতিষ্ঠান তুরাপের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে দেয়া শ্রমবাজার খোলার নতুন ফর্মুলার চিঠিটিও আসে। যদিও এই চিঠির সূত্র ধরে সম্প্রতি মালয়েশিয়ার একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মাসে মালয়েশিয়ার আইটি প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডির পক্ষে অঙ্গপ্রতিষ্ঠান তুরাপের পক্ষ থেকে কর্মী আমদানির লক্ষ্য নতুন ফর্মুলা উল্লেখ করে প্রস্তাব দেয়া হয়। এ নিয়ে মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনের একটি প্রতিনিধিদল গত ৯ মার্চ দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাথে সাক্ষাৎ করেন। হাইকমিশনের প্রতিনিধিদলকে বোঝানো হয়েছে, নতুন এই ফর্মুলায় কর্মী গেলে কোনো খরচ লাগবে না। কর্মীরা শূন্য মাইগ্রেশন কস্টে মালয়েশিয়ায় আসতে পারবে। কোনো সমস্যাও হবে না। কার্যক্রম পরিচালনার জন্য (জিইএফসি) গ্লোবাল এমপ্লয়মেন্ট ফ্যাসিলিটেশন সেন্টারকে ব্যবহার করা হবে। ইউআরপি সলিউশন এসডিএন বিএইচডি (বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডি-এর ১০০% মালিকানাধীন একটি সহায়ক সংস্থা) দ্বারা প্রস্তাবিত।

গতকাল রিক্রুটিং এজেন্সি মাইক্রো এক্সপোর্টের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মোস্তফা মাহমুদ নয়া দিগন্তকে বেস্টিনেটের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান তুরাপের বিষয়ে বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নতুন করে খোলার বিষয়ে বেস্টিনেটের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এবার তারা বলতে চাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে জিরো মাইগ্রেশন কস্টে কর্মী নেবে। এটা স্রেফ মিথ্যা কথা। ১৯৭৯ সাল থেকে এই পর্যন্ত কোনো দিনও মালয়েশিয়ায় কোনো কর্মী বিনা টাকায় যেতে পারেনি। বেস্টিনেট হচ্ছে দাতো আমিন নুরের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। বেস্টিনেট শ্রমবাজারে একটি চিহ্নিত নাম হওয়ায় তারা এবার তুরাপ নাম দিয়ে নতুন করে সিন্ডিকেট করতে চাচ্ছে। আর এই চক্রের সাথে সেই পুরনো লোকগুলোই যেমন স্বপন, নুর আলী, লে. জে. মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীরা রয়েছেন। লে. জে. মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী লিবিয়ার শ্রমবাজারেও সিন্ডিকেট করে কর্মী পাঠানোর চূড়ান্ত প্রক্রিয়া করে ফেলেছিল।

লে. জে. মাসুদ উদ্দিনসহ ১০০ জনের বিরুদ্ধে করা মামলাটি তদন্তের জন্য সিআইডিতে ন্যস্ত করা হয়। সিআইডি কর্তৃক ব্যাপক অনুসন্ধানের পর অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ, মানবপাচার ও মানিলন্ডারিংয়ের কোনো প্রমাণ না পাওয়াতে মামলাটি ভূয়া আখ্যায়িত করে ঢাকা মহানগর মুখ্য হাকিমের আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে। একই সময় মালয়েশিয়া সরকারের নির্দেশে সে দেশের দুর্নীতি দমন কমিশন একই বিষয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান করে জি টু জি প্লাস পদ্ধতিতে কোনো ধরনের হিউম্যান ট্রাফিকিং ও মানি লন্ডারিং সংগঠিত হয়নি বলে মর্মে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করে বলে চিঠিতে দাবি করা হয়। চিঠিতে দুই দেশের দু’টি এজেন্সি কর্তৃক বর্ণিত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় ভিত্তিহীন মামলাগুলো প্রত্যাহার করার জন্য মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি জেনারেল ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে পত্র প্রেরণ করেন। মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিউত্তর দেয়া হয়। কিন্তু মামলা প্রত্যাহার না করে নতুন মামলা রুজু করা হয়।