যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার দাবি নিয়ে ইরানি সামরিক বাহিনীর উপহাস
Printed Edition
সিএনএন
যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের সাথে আলোচনা চলছে বলে হোয়াইট হাউজ যখন জোর গলায় দাবি করছে তখন ইরানের সামরিক বাহিনী উপহাস করে প্রশ্ন তুলেছে, যুক্তরাষ্ট্র নিজের সাথেই আলোচনা চালাচ্ছে কিনা। গতকাল বুধবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বার্তায় ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র কড়া ভাষায় মার্কিন নেতৃত্বকে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রতিশ্রুতির যুগ শেষ’। “তোমাদের অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত কি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে তোমরা এখন নিজেদের সাথেই আলোচনা করছ?” ইরানি সশস্ত্রবাহিনীর ঐক্যবদ্ধ কমান্ড খাতামুল-আম্বিয়ার মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফাকারি এ কথা বলেছেন।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে চুক্তি ‘দৃশ্যমান’ এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ‘এখনই আলোচনা চালাচ্ছেন’ বলে জানিয়েছিলেন। তবে তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো আলোচনায় তারা যায়নি। কেবল কিছু মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে।
“কৌশলগত যে শক্তি নিয়ে একসময় তোমরা গর্ব করতে, তা এখন কৌশলগত পরাজয়ে পরিণত হয়েছে,” বলেছেন জুলফাকারি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা তাদের মনোজগৎ থেকে ইরানে হামলার ভাবনা ‘পুরোপুরি মুছে না ফেলা’ পর্যন্ত জ্বালানি ও তেলের দাম যুদ্ধ-পূর্ববর্তী জায়গায় যাবে না বলেও সতর্ক করেন ইরানি সামরিক বাহিনীর এ মুখপাত্র। তেহরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্পের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তেলের দাম খানিকটা কমতে দেখা গেলেও তা ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগের দামের চেয়ে এখনো অনেক বেশি। সোমবার ট্রাম্প জানান, পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর পরিকল্পনা বাদ দেয়াসহ শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টি শর্ত তেহরানকে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। মার্কিন এসব দাবি ইরান খতিয়ে দেখছে বলে একটি সূত্র সিএনএনকে মঙ্গলবার জানায়। এ দিকে পাকিস্তান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বৈঠক আয়োজনে প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছে। ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা দক্ষিণ এশীয় দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রাম্পের ‘গুডবুকে’ থাকার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ ‘শেষ পর্যায়ে’ থাকলেও বৈঠক আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে খোদ আয়োজকরাই সন্দিহান বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের একটি সূত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা কূটনীতির নামে চরম বিশ্বাসঘাতকতা : ইরান
এ দিকে ইন্ডিয়া টুডে জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের সাথে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’র যে দাবি করা হয়েছে, তাকে স্রেফ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান। গতকাল বুধবার ‘ইন্ডিয়া টুডে’কে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সাথে বর্তমানে কোনো ধরনের সংলাপ বা সমঝোতা চলছে না।
ইসমাইল বাঘায়েই মার্কিন কূটনীতির তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ভয়াবহ ও বিপর্যয়কর। গত ৯ মাসে আমরা যখনই পারমাণবিক ইস্যু সমাধানে আলোচনার টেবিলে বসেছি, ঠিক তখনই আমাদের ওপর দুবার বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। এটি কূটনীতির নামে চরম বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
উল্লেখ্য, গত কয়েক দিন ধরেই ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করে আসছেন যে ইরানের নীতিনির্ধারকদের সাথে তার প্রশাসনের ‘খুবই ভালো’ আলোচনা হচ্ছে এবং ইরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে মরিয়া। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বন্ধুত্বপূর্ণ কিছু দেশ (যেমন পাকিস্তান) আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে এলেও ইরান তাতে এখনো সাড়া দেয়নি। বরং ট্রাম্পের এই দাবিকে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক চাল’ হিসেবে দেখছে তারা।
ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ এবং পররাষ্ট্র মুখপাত্র উভয়েই স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানের জ্বালানি ও সামরিক অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত রেখে আলোচনার কোনো প্রশ্নই আসে না। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন বন্ধ না হবে এবং ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না মিলবে, ততক্ষণ কোনো ‘ডিল’ সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একদিকে ওমান, কাতার ও পাকিস্তানের মাধ্যমে পর্দার আড়ালে বার্তার আদান-প্রদান চললেও প্রকাশ্যে ইরান কোনো নমনীয়তা দেখাতে চাইছে না। বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ অভিযানে বিপুল প্রাণহানি ও খামেনি-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে তেহরান এই মুহূর্তে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোকে নিজেদের জন্য ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে মনে করছে।