শরণখোলায় সংখ্যালঘু পরিবারে হামলা

বাড়িঘর ভাঙচুর লুটপাট করে জমি দখলের চেষ্টা

Printed Edition
3rd-5
বাগেরহাটের শরণখোলার রবীন ঢালীর বসতবাড়ি ভাঙচুরের পর : নয়া দিগন্ত

শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি

বাগেরহাটের শরণখোলায় সংখ্যালঘু (হিন্দু) একটি পরিবারের ওপর হামলা, বসতঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ভুক্তভোগী রবিন ঢালী ২৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো বেশ কয়েক জনের নামে মামলাটি দায়ের করেন। এ ঘটনায় উপজেলার উত্তর রাজাপুর গ্রামের জামাল শিকদারের ছেলে রাজু শিকদার এবং রাজৈর গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে নাইম ইসলাম নামে দুই আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বর্বর এই হামলার ঘটনাটি ঘটে সোমবার দুপুরে উপজেলার ধানসাগর ইউনিয়নের রতিয়া রাজাপুর গ্রামে। ঘটনার পরের দিন (মঙ্গলবার) দুপুরে বাগেরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকারদার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রবিন ঢালীর সাথে তিন-চার বছর ধরে একই এলাকার প্রভাবশালী সোবাহান হাওলাদারের জমিজমা নিয়ে বিরোধ ও মামলা চলে আসছে। এর জেরে সোবাহান হাওলাদার, তার দুই ছেলে মিরাজ ও আব্দুল্লাহ এবং দুই ভাই সরোয়ার ও দেলোয়ারের নেতৃত্বে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি বাহিনী রবিনের বাড়িতে হামলা চালায়। তারা দা, হাতুড়ি, শাবল, লাঠি নিয়ে প্রথমে বসতঘর ভাঙচুর শুরু করে। ঘরের চালা, বেড়াচাটকি ও আসবাবপত্র ভেঙে চুরমার করে ফেলে। এতে বাধা দিলে সন্ত্রাসীরা বাড়ির নারী সদস্যদের মারধর করে।

সন্ত্রাসীদের হামলায় আহতরা হলেন- রবিন ঢালীর স্ত্রী সীমা রানী (৩৫), মা দুলালী রানী (৭০), নানী বেলকা রানী (৯০) এবং তার দুই খালা বিমলা রানী (৬০) ও লীলা রানী (৬৫)। এদেরকে উপজেলা স্বাস্ব্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

রবিন ঢালী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ঘটনার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম না। ব্যক্তিগত কাজে পাশর্^বর্তী মোরেলগঞ্জ উপজেলায় গিয়েছিলাম। এই সুযোগে সোবাহান হাওলাদার উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে এনে আমার বাড়ি জবর দখলের চেষ্টা করেন। সন্ত্রাসীরা বসতঘর, আসবাবপত্র, মালামাল সব ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। দু’টি ট্রাংকে থাকা স্বর্ণালঙ্কার ও জমির দলিলপত্র লুট করে নিয়ে গেছে। বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। তাতে বসবাসের কোনো উপায় নেই। এ অবস্থায় অন্যের বাড়িতে থাকতে হচ্ছে এখন।

রবিন ঢালী আরো বললেন, আমি দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে গার্মেন্টে কাজ করতাম। সেই ফাঁকে আমার দলিলকৃত জমির মধ্য থেকে ১৫ শতাংশ জমি প্রভাবশালী সোবাহান হাওলাদার তার নামে রেকর্ড করিয়ে নেন। পরবর্তীতে বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয়ভাবে বহুবার সালিশ বৈঠক হয়। কিন্তু তাতে কোনো সমাধান না হওয়ায় বাগেরহাট আদালতে বাটোয়ারা মামলা করা হয়। মামলা চলমান থাকা অবস্থায় তারা আমার বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়ে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে জমি দখলের চেষ্টা চালায়। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।

ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নির্মল হালদার ও বিজন হালদার বলেন, আমাদের চোখের সামনে যেভাবে ত্রাস সৃষ্টি করে ভাঙচুর, লুটপাট চালিয়েছে তা আমাদের সাথে ’৭১ সালেও হয়নি।

উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি বাবুল দাস ও সাধারণ সম্পাদক গোপাল কর্মকার বলেন, হিন্দুপাড়ার এই ঘটনাটি সংখ্যালঘুদের আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার পাশপাশি ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।

শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: শামিনুল হকের ভাষ্য, হামলার খবর পেয়ে রবিন ঢালীর বাড়িতে ছুটে যাই। সেখানে পুলিশ পৌঁছানোর আগে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র, লাঠি জব্দ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ঘটনায় রবিন ঢালী বাদি হয়ে ২৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো বেশ কয়েক জনের নামে মামলা করেছেন। দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলমান রয়েছে।