ইসলামাবাদে বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক আজ
লেবাননে হামলা, হরমুজ বন্ধের মধ্যেই পাকিস্তানের পথে জেডি ভ্যান্স
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরানের সাথে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা করতে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ভ্যান্সের সাথে ইসলামাবাদে যাওয়ার কথা আছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে গতকাল শুক্রবার লেবাননে নতুন করে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। একইসাথে হরমুজ প্রণালী এখনো অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই এই হামলাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে যাওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি এই আলোচনা থেকে ইতিবাচক ফলাফলের আশা করছেন। তবে তেহরানকে সতর্ক করে তিনি বলেন, যদি তারা আমাদের সাথে কোনো ধরনের চাতুরীর চেষ্টা করে, তবে তারা দেখবে যে এই আলোচনা কমিটি মোটেও নমনীয় নয়।
দুই দিন আগে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি বিমান হামলা বন্ধ হলেও হরমুজ প্রণালীর অবরোধ কাটেনি। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিঘœ ঘটছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ইরানের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ‘খারাপ কাজ’ করছে। এ ছাড়া জাহাজগুলো থেকে পারাপারের ফি সংগ্রহের বিষয়েও তেহরানকে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, আমাদের চুক্তিতে ফি আদায়ের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
ইসলামাবাদে নি-িদ্র নিরাপত্তা
আলোচনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে জরুরি ভিত্তিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং পুরো শহরকে লকডাউনের আওতায় আনা হয়েছে। হোটেলের চারপাশে তিন কিলোমিটার এলাকাকে ‘রেড জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে এবং বর্তমানে দুই প্রতিনিধিদলের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে। আজ শনিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখোমুখি আলোচনার কথা থাকলেও শুক্রবার কোনো সরাসরি বৈঠক হয়নি।
লেবাননে প্রাণহানি ও যুদ্ধবিরতি বিতর্ক
ইরান দাবি করেছে যে, যুদ্ধবিরতির শর্ত লেবাননের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। শুক্রবারও দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি হামলায় এক ডজনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আটজন লেবাননের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বলে জানা গেছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইসরাইল লেবাননে যে ভয়াবহ হামলা চালায়, তাতে ২৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অবশ্য গত বৃহস্পতিবার একটি কৌশলী পরিবর্তন এনেছেন। তিনি জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে এবং যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে তিনি লেবানন সরকারের সাথে আলাদাভাবে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর নিশ্চিত করেছে যে, আগামী সপ্তাহে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব
জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি থমকে গেছে এবং বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শুক্রবার প্রকাশিত মার্কিন তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম ০.৯ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২২ সালের পর থেকে দ্রুততম হার।
হরমুজ প্রণালীতে বর্তমানে কেবল ইরানের নিজস্ব জাহাজগুলো নির্বিঘেœ চলাচল করতে পারছে। যেখানে যুদ্ধের আগে দৈনিক গড়ে ১৪০টি জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রম করত, সেখানে বর্তমানে ১০ শতাংশেরও কম জাহাজ চলাচল করছে। এর প্রভাব তেলের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরানের পারমাণবিক অবস্থান ও তেহরানের দাবি
ট্রাম্প এই যুদ্ধে জয় দাবি করলেও তার মূল লক্ষ্যগুলো- যেমন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা বা শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করা- পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। ইরানের কাছে এখনো ৪০০ কেজির বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে, যা বোমা তৈরির সক্ষমতার কাছাকাছি।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে সাফ জানিয়েছেন, যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির জন্য তারা ক্ষতিপূরণ দাবি করবেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে যারা অপরাধমূলক হামলা চালিয়েছে, তাদের আমরা অবশ্যই শাস্তি ছাড়া ছেড়ে দেব না। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের সব ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা ত্যাগ করুক।
ইসলামাবাদের এই আলোচনা সফল হবে কি না, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে এই বৈঠকের গুরুত্ব অপরিসীম।
যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বেছে নিতে হবে
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ বলেছেন, লেবাননে চলমান ইসরাইলি হামলা ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির শর্তের গুরুতর লঙ্ঘন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ অথবা যুদ্ধবিরতি- যে কোনো একটি বেছে নিতে হবে। গত বৃহস্পতিবার বিবিসির সাথে আলাপকালে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ এ কথা বলেন।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে গত বুধবার দেশটিতে ইসরাইলের ভয়াবহ হামলায় তিন শতাধিক মানুষ নিহত হয়। এর আগে ওই দিন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। এই যুদ্ধিবরতির মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান বলেছে, লেবাননও যুদ্ধবিরতির আওতায় আছে। ইরানও সেটাই বলছে। বিশ্বনেতারা কার্যকর যুদ্ধিবরতির জন্য লেবাননে হামলা চালানো বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বলছে, লেবানন যুদ্ধবিরতির আওতায় নেই।
উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ বিবিসি রেডিও ৪-এর টুডে প্রোগ্রামে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধ ও যুদ্ধবিরতির মধ্যে’ একটি বেছে নিতে হবে এবং ‘একই সাথে কেক রাখা এবং খাওয়া যাবে না।’
লেবাননে হামলা অব্যাহত
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা (এনএনএ) জানিয়েছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে দেইর কানুন রাস আল-আইন শহরে ইসরাইলি বিমান হামলায় বেশ কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ারট্রাক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী অভিযোগ করেছে, হিজবুল্লাহর লেবাননের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। তাই হামলা অ্যাম্বুলেন্সকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। তবে ইসরাইল এই অভিযোগের সমর্থনে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি।
এ দিকে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। ইরানপন্থী এই সশস্ত্র দলটি জানায়, তাদের যোদ্ধারা শুক্রবার ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলের কিরিয়াত শিমোনা এলাকায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে। আর মেতুলা, মারগালিওত এবং মিসগাভ আমের এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।