জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ডিপো থেকে তেল সরবরাহের সময়সূচির বড় পরিবর্তন

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই অস্থিরতার ঢেউ থেকে নিজস্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ডিপো থেকে তেল বিপণনের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনে তা দুই ঘণ্টা এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি তাৎপর্যপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ডিপো থেকে জ্বালানি পণ্য সরবরাহ করা হবে। এর আগে এই সময়সূচি ছিল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। অর্থাৎ সরবরাহ কার্যক্রম শুরু ও শেষ উভয় সময়ই দুই ঘণ্টা এগিয়ে আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিবর্তনের ফলে দিনের আলোতেই অধিকাংশ কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হবে, যা নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেবে।

বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্ঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নির্দেশনায় বিপিসি তাদের অধীনস্থ বিপণন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সময়সূচির এই পরিবর্তন কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। সকালে সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হলে পরিবহনব্যবস্থাও তুলনামূলকভাবে কম চাপের মধ্যে থাকে। ফলে দ্রুত ও নিরাপদে জ্বালানি পরিবহন নিশ্চিত করা সহজ হয়।

এ ছাড়া নতুন সময়সূচির ফলে ডিপো থেকে ফিলিংস্টেশন পর্যন্ত জ্বালানি পৌঁছাতে কম সময় লাগবে, যা খুচরা পর্যায়ে সরবরাহে কোনো ধরনের ঘাটতি বা বিলম্বের ঝুঁকি কমাবে। বিশেষ করে, শহরাঞ্চলে যানজটের কারণে বিকেলের দিকে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ার যে প্রবণতা রয়েছে, তা অনেকাংশে কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, দেশের সব ফিলিংস্টেশন, প্যাকড পয়েন্ট ডিলার এবং পাম্পে জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রমকে আরো সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করতে এই সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে করে সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা ও সমন্বয় বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বিপিসির অধীনস্থ তিনটি প্রধান বিপণন কোম্পানিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এগুলো হলো- পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড এবং যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড। এই তিনটি প্রতিষ্ঠান সারা দেশে জ্বালানি বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে এবং তাদের কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই নতুন সময়সূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার সময় দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতাই একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রেক্ষাপটে বিপিসির এই উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত। তবে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি ও সমন্বয় প্রয়োজন হবে।

অন্য দিকে ডিলার ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সকালে কাজ শুরু করতে হলে তাদের প্রস্তুতি ও লজিস্টিক ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। আবার অনেকেই বলছেন, দিনের আলোতে কাজ শেষ হওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে এবং কার্যক্রম আরো সহজ হবে।

বিশ্লেষকরা আরো উল্লেখ করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে জ্বালানি খাতে আরো বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। যেমন- বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধি, মজুদ সক্ষমতা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দেয়া। তবে আপাতত সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে সময়সূচির এই পরিবর্তন একটি তাৎক্ষণিক এবং কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ডিপো থেকে তেল সরবরাহের সময় দুই ঘণ্টা এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর ও স্থিতিশীল করতে সহায়ক হবে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এ সময়ে এমন উদ্যোগ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।