কালো তালিকাভুক্ত প্রেসের দাপট, ইনস্পেকশন এজেন্টকে হুমকি
Printed Edition
- ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ২৮ প্রেসের ১৬ লাখ বইয়ে ত্রুটি শনাক্ত
- প্রতিকার চেয়ে এনসিটিবিতে লিখিত আবেদন করবে আজ
অনিয়ম আর ত্রুটিপূর্ণ বই ছাপার কারণে বিগত দিনে কালো তালিকাভুক্ত থাকলেও এখনো দাপট কমেনি অভিযুক্ত কিছু প্রেস মালিকের। আওয়ামী আমলে তারা ধরাকে সরাজ্ঞান করে চললেও ২০২৪ এর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পরেও মানহীন বই ছেপে শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতারণা করেছে তারা। চলতি ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই মুদ্রণেও ইতোমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনিয়মও ধরা পড়েছে। তবে নিম্নমানের পাঠ্যবই ছেপে এখন নিজেদের গা বাঁচাতে তারা উল্টো ইনস্পেকশন এজেন্টকেই হুমকি দিচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রেসে মুদ্রিত নিম্নমানের বই জব্দ করে এ সংক্রান্ত পিএলআই (পোস্ট ল্যান্ডিং ইনস্পেকশন) রিপোর্ট জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) জমা দিয়েছে সরকার নিয়োজিত হাইটেক সার্ভেয়ার বিডি নামে একটি ইনস্পেকশন কোম্পানি। কিছু প্রেসের বই ত্রুটিপূর্ণ ধরা পড়ায় এবং তাদের রিরুদ্ধে রিপোর্ট এনসিটিবিতে জমা দেয়ায় এই ইনস্পেকশন এজেন্টকে প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। অবশ্য এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে এনসিটিবিতে মৌখিকভাবে অভিযোগও দেয়া হয়েছে। তবে আজ রোববার কয়েকটি প্রেসের এই হুমকির বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বরাবরে ইনস্পেকশন এজেন্টের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দেয়া হবে বলে জানা গেছে।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যের পাঠ্য পৌঁছে দেয়ার পর সেখান থেকে বইয়ের নমুনা সংগ্রহ করে বইয়ের মান শর্ত মোতাবেক সবকিছু ঠিক রয়েছে কি না তা যাচাই করতে ইনস্পেকশন এজেন্ট নিয়োগ দেয় এনসিটিবি। যদিও এর আগে পাঠ্যবই মুদ্রণের সময়েই এক দফায় ইনস্পেশন করেছে পৃথক আরেকটি এজেন্ট। যাকে বলা হয় পিডিআই (প্রি ডেলিভারী ইনস্পেকশন) এজেন্ট। এই দুই দফা ইনস্পেকশনের পরেই প্রেস মালিকরা তাদের ছাড়পত্র পেলে তারা বই মুদ্রণের সমুদয় বিল হাতে পাবেন। এখন দ্বিতীয় দফার পিএলআই রিপোর্ট মাঠপর্যায় থেকে সংগ্রহ করে সেই আলোকেই রিপোর্ট এনসিটিবিতে জমা দেবে পিএলআই এজেন্ট। তাই ত্রুটিপূর্ণ বই ছেপে যারা ধরা পড়েছেন তারাই এখন নানাভাবে হুমকি আর রিপোর্টও পাল্টাতেও নানাভাবে ফন্দিফিকির করছেন।
এনসিটিবি সূত্র আরো জানায়, এবার পিএলআই এজেন্ট নিয়োগ দেয়ার আগেই মুদ্রিত বইয়ের টেকনিক্যাল স্পেশিফিকেশন অনুযায়ী (এনেক্সার এ, ধারা ৫ অনুসারে) ছয়টি বিষয়ে অনুসন্ধান বা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রিপোর্ট প্রস্তুত করার শর্ত দেয়া হয়। সেখানে স্পষ্টত কভার পেজের জিএসএম বা কাগজের পুরুত্ব, ইনার পেজের জিএসএম, বইয়ের পৃষ্ঠার দৈর্ঘ ও প্রস্থের ম্যাজারমেন্ট, বাইন্ডিং এবং বইয়ের ছাপা বা মুদ্রণ কোয়ালিটি বিবেচনায় নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট এনসিটিবিতে জমা দেয়ার জন্য পিএলআই এজেন্টকে শর্ত দেয়া হয়। এসব শর্ত সঠিকভাবে প্রতিপালন হয়েছে কি না তা বিবেচনায় নিয়ে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ২৮টি প্রেসের মোট ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৮৪২ কপি বই ত্রুটিপূর্ণ পেয়েছে পিএলআই এজেন্ট। প্রেসগুলো হলো- মেসার্স মহানগর অফসেট প্রিন্টিং প্রেস, নাইমা আর্ট প্রেস, অ্যামাজন প্রিন্টিং প্রেস, লেটার অ্যান্ড কালার, বর্ণমালা প্রেস, রেদওয়ানিয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন, ন্যাশনাল প্রিন্টার্স, দোয়েল প্রিন্টার্স, দি গুডলাক প্রিন্টার্স, মিলন প্রিন্টিং প্রেস, অনুপম প্রিন্টার্স লি: মেসার্স নাহার প্রিন্টার্স, সুবরানা প্রিন্টার্স, শফিক প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস, অক্সফোর্ড প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন, এরিস্টোক্রেটস সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লি:, মেসার্স টাঙ্গাইল প্রিন্টার্স, পিবিএস প্রিন্টিং, ভাই ভাই প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন, জিতু অফসেট প্রিন্টিং প্রেস, মেসার্স ঢাকা প্রিন্টার্স, মেসার্স ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, মাস্টার সিমেক্স পেপার লি:, পাঞ্জেরী প্রিন্টার্স, সরকার অফসেট প্রেস প্রভৃতি।
উল্লেখিত প্রেসগুলোর মধ্যে পতিত আওয়ামী সরকারের আমলেই নানা অনিয়ম আর ত্রুটিপূর্ণ মুদ্রণের জন্য তিনটি প্রেসের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ছিল। এ তিনটি প্রেস হচ্ছে অ্যামাজন প্রিন্টিং প্রেস, নাইমা আর্ট প্রিন্টার্স এবং মেসার্স মহানগর অফসেট প্রিন্টিং প্রেস। এবারো এই প্রেসগুলো ত্রুটিপূর্ণ বই মুদ্রণ করে সমালোচনায় পড়েছে। তাদের বিল নিয়ে তারা পড়েছেন বিপাকে।
পিএলআইর জন্য মনোনীত এজেন্ট হাইটেক সার্ভেয়ার বিডির এক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, গত ১৯ জুন বৃহস্পতিবার এনসিটিবির বিতরণ শাখার কর্মকর্তা আমাদের কোম্পানির স্বত্বাধিকারী আবদুস সালাম মোল্লাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন পিএলআই রিপোর্টের কিছু বিষয়ে জানার জন্য। কিন্তু ওই দিন এনসিটিবিতে উপস্থিত থেকে কালো তালিকাভুক্ত তিন প্রেসের লোকজন আমাদের রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তারা আঙুল তুলে তেড়ে আসেন। এর আগে গত বুধবার মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেডের পার্টনার ইমরান হোসেন টেলিফোনে আমাদের পিএলআই এজেন্টের তৈরিকৃত রিপোর্ট এনসিটিবিতে জমা না দেয়ার জন্য হুমকিও দিয়েছে। তারা আমাদের রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা এবং বস্তুনিষ্ঠতা নিয়েও অশোভন মন্তব্য করেছে।
এসব বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় হাইটেক সার্ভেয়ার বিডির স্বত্বাধিকারী আব্দুস সালাম মোল্লা নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের রিপোর্টের কোনো অসঙ্গতি থাকলে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এনসিটিবি আমাদের সাথে আলোচনা করবে। আমরা আমাদের ক্লিয়ারিফিকেশন দেবো। এখানে আমাদের কাছ থেকে যে রিপোর্ট জমা দেয়া হয়েছে সেই রিপোর্ট অভিযুক্ত প্রেস মালিকরা আগেই পেয়ে গেল কিভাবে? যদিও এই রিপোর্ট আমরা নিয়মমতো সিলগালা করেই গোপনীয়ভাবে এনসিটিবিতে জমা দিয়েছি। এখানে প্রেস মালিকদের সাথে এনসিটিবির কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না সেটিও তদন্তের দাবি রাখে। তিনি আরো বলেন, এর আগে গত বৃহস্পতিবার আমাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়ার বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এনসিটিবিকে জানিয়েছি। আমরা নিয়মমতো আগামীকাল (আজ রোববার) লিখিতভাবে বিষয়টি এনসিটিবির চেয়ারম্যানকে জানাবো।
এ দিকে পিএলআই এজেন্টকে হুমকি দেয়ার বিষয়ে গতকাল মাস্টার সিমেক্সের ইমরান হোসেন জানান, উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমাদের বইয়ের বিষয়ে নেগেটিভ রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। এনসিটিবি যেখানে সারা দেশ থেকে বই সংগ্রহ করে বইয়ের মান যাচাই করে আমাদের একটি বইয়েরও কোনো সমস্যা পায়নি সেখানে ইনস্পেকশন এজেন্ট কিভাবে আমাদের বইয়ের বিষয়ে এমন একটি অবাস্তব রিপোর্ট দিয়েছে? তবে তিনি স্বীকার করেন এজেন্টের মালিকের সাথে ফোনে আমার কথা হয়েছে মাত্র। তবে আমি তাদেরকে কোনো হুমকি দেইনি। আমরা চেয়ারম্যান বরাবরে পিএলআই রিপোর্ট পুনঃনিরীক্ষার আবেদন করেছি। এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মো: হাফিজুর রহমান জানান, পিএলআই রিপোর্ট নিয়ে ইনস্পেকশন এজেন্টের সাথে কয়েকজন প্রেস মালিকের ভুলবোঝাবুঝি হয়েছে। আমরা দুই পক্ষকেই বিষয়টি নিয়ে আর কোনো ঝামেলায় জড়াতে নিষেধ করেছি। আশা করছি দুই পক্ষই নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনবেন।