পাকিস্তানের সিদ্ধান্তে উত্তাল ক্রিকেটবিশ^

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে দশম টি-২০ বিশ্বকাপ শুরু হবে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি। তার আগেই বাংলাদেশ ইস্যু থেকে জন্ম নেয়া বিতর্কে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান তাদের অবস্থানে অনড় থাকে, নাকি আইসিসির হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির মোড় ঘোরে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে পুরো ক্রিকেট বিশ্ব।

টি-২০ বিশ্বকাপ শুরুর আগ মুহূর্তে জটিল পরিস্থিতির মুখে আইসিসি। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণায় বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। বহুল প্রতীক্ষিত এই ম্যাচ ঘিরে যেখানে আইসিসির বাণিজ্যিক পরিকল্পনা, দর্শক আগ্রহ এবং টুর্নামেন্টের ভারসাম্য জড়িয়ে, সেখানে এমন সিদ্ধান্ত অনিশ্চয়তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

শহীদ আফ্রিদি

ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার সিদ্ধান্তে দুঃখ পেয়েছেন আফ্রিদি। তবে সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে এক্সে আফ্রিদি লিখেছেন, ‘আমি সব সময় বিশ্বাস করি, রাজনীতি যেখানে দরজা বন্ধ করে দেয়, ক্রিকেট সেখানে নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। দুঃখজনকভাবে পাকিস্তান এবার টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে খেলবে না। সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করি। এখন আইসিসির উচিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এটা প্রমাণ করা যে, তারা নিরপেক্ষ, স্বাধীন এবং সব সদস্য দেশের প্রতি ন্যায়সঙ্গত।’

এর আগে গত বছর এজবাস্টনে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অব লিজেন্ডসে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল ভারতের সাবেক ক্রিকেটাররা। ক্রীড়াঙ্গনে রাজনীতি প্রবেশ করায় সে সময়ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন আফ্রিদি।

মোহাম্মদ ইউসুফ

পাকিস্তানের সাবেক ব্যাটিং তারকা মোহাম্মদ ইউসুফ এই সিদ্ধান্তকে মূল্যবোধের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন। তার মতে, সরকারের জন্য অবস্থানটি কঠিন হলেও প্রয়োজন ছিল। এক্সে দেয়া এক বার্তায় ইউসুফ বলেন, বাণিজ্যিক স্বার্থের আগে নীতিগত অবস্থানকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি। বিশ্ব ক্রিকেটে সুবিধাবাদী প্রভাব বন্ধ না হলে ক্রিকেট সত্যিকার অর্থে বৈশ্বিক হতে পারবে না।

বাংলাদেশ ইস্যুতে আইসিসির ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। আইসিসির সিদ্ধান্তকে দ্বিচারিতা আখ্যা দিয়ে ইউসুফ বলেন, ‘বাংলাদেশের ন্যায্য নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষা করা আইসিসির ধারাবাহিকতা ও শাসনব্যবস্থার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তোলে এবং ক্রিকেটকে প্রভাব নয়, নীতি অনুযায়ী পরিচালনা করা উচিত।’

মোহাম্মদ হাফিজ

তবে পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ হাফিজ ইউসুফের সাথে একমত নন। তার মতে, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত ভক্তদের হতাশ করেছে।

ভারত ভাবেনি ঘটনা এতদুর গড়াবে : শশী থারুর

এক মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেয়ার ঘটনা যে এতদূর গড়াবে, ভারত হয়তো তা কল্পনাও করেনি। বিষয়টি এখনো পুরোপুরি রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। আর এমন পরিস্থিতিতে ভারতের এক রাজনীতিবিদ শশী থারুর আহ্বান জানালেন, উপমহাদেশের তিন দেশ বিভেদ ভুলে যেন এক হয়ে যায়।

মদন লাল

সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার মদন লাল মনে করেন, ‘বাংলাদেশকে সমর্থন জানাতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার ও পিসিবি শেষ পর্যন্ত নিজেদের ক্রিকেটেরই ক্ষতি করছে। এই সিদ্ধান্তে কোনো সমস্যার সমাধান হবে না বরং বাংলাদেশ ও পাকিস্তান- উভয় দেশই এর ফল ভোগ করবে।

সুনীল গাভাস্কার

এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন সুনীল গাভাস্কার। টুর্নামেন্টের ঠিক আগমুহূর্তে এমন সিদ্ধান্ত আইসিসির জন্য বড় সমস্যা সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ানো হলে আইসিসির হস্তক্ষেপ করা উচিত এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো দল এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার সাহস না পায়, সে জন্য দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আইনি পথেও যেতে পারে আইসিসি, যদিও সেই প্রক্রিয়ার ফল কী হবে, তা নিশ্চিত নয়।’

বাংলাদেশকে ফেরালেই খেলবে পাকিস্তান : রশিদ লতিফ

বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে ফিরিয়ে আনলেই পাকিস্তান ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে রাজি হয়ে যাবে। এমন মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার রশিদ লতিফ। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে পিসিবি যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে ক্রিকেটের বাজারে ধস নামবে বলেও মনে করছেন এই সাবেক উইকেটরক্ষক ব্যাটার।

আইসিসি বাংলাদেশের দাবি নাকচ করে স্কটল্যান্ডকে নেয়। এর প্রতিবাদে পাকিস্তান ১৫ ফেব্রুয়ারির ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে মাঠে না নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নিয়ে তোলপাড় ক্রিকেট দুনিয়ায়। হাই ভোল্টেজ লড়াই মাঠে না গড়ালে কোটি কোটি ডলার লোকসান হবে আইসিসিরও। জিও নিউজকে রশিদ লতিফ বলেন, ‘পাকিস্তান সরকার নিজেই প্রেস রিলিজ বা টুইট করেছে, যাতে আইনি জটিলতা থেকে বাঁচা যায়। কারণ যখন সরকার কোনো বিষয়ে সরাসরি জড়িত হয়ে পড়ে, তখন আইসিসির আর করার কিছু থাকে না।’

পাকিস্তানের পদক্ষেপের প্রশংসায় বলেন, ‘পাকিস্তান সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ এটি বিলিয়ন ডলারের ব্রডকাস্টারদের বাজার, যা এখন মিলিয়নে নেমে আসবে। আইসিসি প্রায় ১০০-১৫০টি সদস্য দেশকে ফান্ডিং দেয়। যেখানে ৩ বিলিয়ন ডলারের বাজার ছিল, সেটি ১ বিলিয়নে নেমে এলে সবার ফান্ডিংয়ে টান পড়বে।’

রশিদ লতিফ মনে করেন, বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে ফিরিয়ে আনলেই পাকিস্তান ভারতের সাথে খেলতে রাজি হয়ে যাবে। ‘এখন পাকিস্তানকে মর্যাদা দিলে এবং বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দেয়া হলেই কেবল পাকিস্তান ভারতের সাথে খেলবে। না খেললে আইসিসির ওপর অবশ্যই এর বড় প্রভাব পড়বে। বর্তমানে আইসিসি মূলত বিসিসিআইয়ের লোকেরাই চালাচ্ছে। জয় শাহ এখন বুঝতে পারবেন যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল কিভাবে পরিচালনা করতে হয়।’

এ সময় ক্রিকেট বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। বলেছেন, ‘অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইংল্যান্ডকে এখন আলোচনার টেবিলে আসতে হবে এবং স্বীকার করতে হবে যে বাংলাদেশের সাথে অবিচার হয়েছে।’