প্রতিশ্রুতি থেকে সরব না : প্রধানমন্ত্রী

৫ বছরে ৪ কোটি পরিবারে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছাবে

Printed Edition
first-2
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আসা নারীদের সাথে কুশল বিনিময় করেন : পিআইডি

নিজস্ব প্রতিবেদক

জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি থেকে কোনো পরিস্থিতিতেই বিএনপি সরে আসবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলাম, তা থেকে বিন্দুমাত্র অবস্থান পরিবর্তন করব না। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ক্ষেত্রবিশেষে কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে হয়তো সময় বেশি লাগতে পারে। তাই সবাইকে ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলার অনুরোধ করছি। গতকাল মঙ্গলবার মহাখালীর কড়াইলে বনানী টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নতুন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা: জুবাইদা রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন। এতে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন, সমাজকল্যাণ সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, এমপি, কূটনীতিকসহ সরকারের বিভিন্ন দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন, বেদ, ত্রিপিটক, বাইবেল পাঠের পর বিএনপি দলীয় সঙ্গীত পরিবেশ করা হয়। অনুষ্ঠানে ফ্যামিলি কার্ডের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রধান অতিথির আগে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো: জাহিদ হোসেন বক্তব্য রাখেন। এরপর পরিবেশন করা হয় জাতীয় সঙ্গীত। এ অনুষ্ঠানে ১৭ জন নারীর হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কার্ড তুলে দেয়ার পরপরই সরকারপ্রধান ল্যাপটপে একটি বাটন প্রেস করেন, সাথে সাথে উপকারভোগীদের কাছে নগদ অর্থ চলে যায়। এ সময় করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।

তাকের রহমান বলেন, এ দেশটি আমাদের প্রথম এবং শেষ ঠিকানা। এ দেশের মানুষের প্রত্যাশা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের কাছে অনেক... সেটি আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু একই সাথে আমরা যদি বাস্তবতা বিবেচনা করি এবং সমসাময়িক ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের যে পরিস্থিতি সব কিছু যদি বিবেচনা করি তাহলে আমরা যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলাম আমরা অবশ্যই আমাদের প্রতিশ্রুতি থেকে বিন্দুমাত্র আমরা অবস্থান পরিবর্তন করবো না। ইরান যুদ্ধের জেরে অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেবল কিছুটা সময় প্রয়োজন হতে পারে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর কথায়, তারা একটি দায়িত্বশীল সরকারের ভূমিকা পালন করতে চান। যে সরকার জনগণ ও দেশের জন্য কাজ করবে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকতে চায়। আমাদের দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নির্বাচনের পূর্বে বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। বাংলাদেশের নারী সমাজের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে, বিএনপি সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে আমরা এই ফ্যামিলি কার্ডের কাজ শুরু করব। তিনি বলেন, আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে বিগত নির্বাচনে সরকার গঠন করার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আমাদের এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি। সেই জন্য শুকরিয়া আদায় করছি। আজকের দিনটি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ, স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক দিন। কারণ, আপনাদের প্রত্যক্ষ ভোটে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই আমরা জবাবদিহি করতে বাধ্য।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের চার কোটি পরিবারে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেয়া হবে। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী এবং তাদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না করে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করতেই সরকার এই কর্মসূচি চালু করেছে।

তারেক রহমান বলেন, সমগ্র বাংলাদেশে ১৪টি জায়গায় বা ১৪টি উপজেলায় এই কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে এই মুহূর্তে প্রায় ৩৭ হাজার নারী অংশগ্রহণ করছে। আমাদের এই কড়াইল এলাকা, ভাসানটেক এলাকা এবং সাততলা, এই তিন এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার নারীকে এই কার্ডের সুবিধার আওতায় আজকে নিয়ে আসা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমার সরকার পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে যে চার কোটি পরিবার রয়েছে, সেই চার কোটি পরিবারে যারা নারীপ্রধান, তাদের কাছে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সবার কাছে এই ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে যেতে সক্ষম হবো ইনশা আল্লাহ।

তিনি জানান, ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর কাজও শুরু হয়েছে এবং আগামী মাসের মধ্যে অনেক কৃষকের হাতে সেই কার্ড তুলে দেওয়া সম্ভব হবে। এ ছাড়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা কৃষক ভাইদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, যাদের কৃষিঋণ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আছে, সুদসহ সেই ঋণ আমরা মওকুফ করব। গত সপ্তাহে সেই ঋণ মওকুফ করা হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালুর দিনটি তার জন্য ব্যক্তিগতভাবে আবেগঘন বলেও উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, এই ফ্যামিলি কার্ডটি ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য অত্যন্ত আবেগঘন। কারণ অনেক বছর ধরে আমরা পরিকল্পনা করেছি, সুযোগ পেলে এটি বাস্তবায়ন করব। আল্লাহর রহমতে আজকে আমরা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পেরেছি।

বক্তব্যের শেষে তিনি তার নির্বাচনী স্লোগান মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, প্রত্যেকটি নির্বাচনী জনসভায় একটি কথা আমার বক্তব্যের শেষে আমি তুলে ধরতাম। সেই কথাটি ছোট্ট একটি স্লোগানের মাধ্যমে আপনাদের সবার কমবেশি জানা আছে, সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্লোগানটি পৌঁছে গেছে। আজকে সেই স্লোগানটি দিয়েই আমি আমার বক্তব্য শেষ করতে চাই, সেই স্লোগানটি ছিল : করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ! সবার আগে বাংলাদেশ!

রাজধানীর বনানীতে টিঅ্যান্ডটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ডের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী সেখানে পৌঁছান। তবে, মঞ্চে ওঠার আগেই তিনি সোজা চলে যান মাঠে অপেক্ষমাণ নারীদের কাছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন নারীরা। নানা স্লোগান দেন তারা। দেশের প্রধানমন্ত্রীকে এতো কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেকে।

যারা পেলেন : প্রধানমন্ত্রী প্রথম কার্ডটি তুলে দেন কড়াইল এলাকার বাসিন্দা মোছা: পারভিন বেগমের হাতে। এরপর পর্যায়ক্রমে বেগম বাসুদা, বেগম পারভিন, বেগম স্বর্না, বুকনা বেগম, বেগম জোসনা, মোছাম্মৎ তাসলিমা আক্তার, বেগম রাশিদা আক্তার, বেগম হোসনা আক্তার, রিনা বেগম, বেগম শামসুন্নাহার, রোকসানা আক্তার, মোসাম্মৎ মারফুজা, বেগম রিনা আক্তার, মোসাম্মৎ সুমি খাতুন, আকলিমা বেগম, মিনারা বেগমের হাতে কার্ড তুলে দেন।

কার্ড পাওয়ার পর অনুভূতি প্রকাশ করেন রিনা বেগম। তিনি জানান, তার তিন ছেলে মেয়ে। বড় মেয়ে নবম শ্রেণীতে পড়ে । মেজো ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে এবং ছোট মেয়ে পড়ে পঞ্চম শ্রেণীতে। প্রধানমন্ত্রী প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিনা বেগম বলেন, ‘আমরা জীবনে কল্পনা করিনি এই কার্ডটি পাবো, কার্ডটি আমার কাছে স্বপ্নের মতো, কার্ডটি পেয়ে আমি অনেক খুশি। আমার অনেক উপকার হবে। এ টাকায় আমি ছেলে-মেয়েদের খাতা-কলম, পরিবারের বাজার যেমন চাল-ডাল, তরকারি কিনতে পারবো।’

অনুভূতি প্রকাশে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বেগম রাশিদা ডাক্তার বলেন, ‘আমি ভাষানটেক বস্তি থেকে এসেছি। ভাষানটেক বস্তিবাসীদের কার্ড দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি বাটনে চাপ দেয়ার সাথে সাথে আমার অ্যাকাউন্টে টাকা চলে এসেছে। টাকা পেয়েছি। এতে আমার খুব উপকার হবে। স্বামীর একার আয়ে আমরা চলতে পারি না। এ টাকা দিয়ে আমি কিছুটা হলেও প্রতি মাসে স্বামীর পাশে দাঁড়াতে পারবো। প্রধানমন্ত্রী আল্লাহ আপনাকে সুস্থতা দান করুন। আপনার মঙ্গল কামনা করি, আপনার পরিবারের মঙ্গল কামনা করি।’