ঢাকার জন্য মিয়ানমারের আকাশসীমা বন্ধের ষড়যন্ত্র আ’লীগের

দায়িত্ব দেয়া হয়েছে লবিস্ট ফার্মকে

এস এম মিন্টু
Printed Edition

মানবিক করিডোর নিয়ে আলোচনার মধ্যে এবার বাংলাদেশ থেকে চলাচলে মিয়ানমারের আকাশসীমা বন্ধের জন্য বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র করছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। তাদের একটি অংশ চীনের সাথে সমন্বয় করে মিয়ানমারের মাধ্যমে বাংলাদেশের আকাশসীমা বন্ধের উদ্যোগ নিচ্ছে। যার লক্ষ্য, করিডোর ইস্যুতে মিয়ানমারকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করা। এই উদ্দেশ্যে তারা একটি লবিস্ট ফার্মকে দায়িত্ব দিয়েছে বলে জানা গেছে। এ সংক্রান্ত তথ্য সম্প্রতি লন্ডনে অবস্থানরত কিছু নেতার ব্যক্তিগত আলাপচারিতা থেকে ফাঁস হয়েছে। গোয়েন্দাদের একটি সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমারের আকাশ পথ ব্যবহার বন্ধের জন্য এরই মধ্যে চীন ও মিয়ানমারের সাথেও তারা যোগাযোগ করেছে। সূত্র জানিয়েছে, ভারত ও লন্ডনে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিরতা এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে মিয়ানমারের আকাশসীমা ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে ছেড়ে যাওয়া বিপুলসংখ্যক বিমান ফ্লাইট থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত চলাচল করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আকাশসীমা বন্ধের জন্য তারা লবিস্ট নিয়োগ করলে বাংলাদেশও বসে থাকবে না। তবে এ ক্ষেত্রে দালিলিক প্রমাণও প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আইনও মানতে হবে।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বর্তমানে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, মিয়ানমারের আকাশ পথ বন্ধের জন্য যদি লবিস্ট নিয়োগ করা হয় তাহলে আমাদের সরকারও বসে থাকবেন না। এ ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তি স্বার্থে লবিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে এ ধরনের সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা কম। একটা দেশের বিরুদ্ধে এত বড় সিদ্ধান্ত নেয়াটাও সহজ নয়। তিনি বলেন, চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বর্তমানে খুবই ভালো। আমার মনে হয় চীন এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিবে না।

এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, সম্প্রতি চীন স্পষ্ট বলে দিয়েছে করিডোর নিয়ে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এই ইস্যুতে চীনের সমন্বয়ে আকাশসীমা বন্ধের যে প্রশ্ন উঠেছে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ চীন সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে করিডোর নিয়ে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। সেখানে মিয়ানমারের আকাশসীমা বাংলাদেশীদের জন্য বন্ধ করার প্রশ্নই উঠে না।

তিনি বলেন, তবে চীন আরেকটি কথা বলেছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তা হলো মিয়ানমারের যাতে স্বার্বভৌমত্ব ক্ষুণœœ না হয় সে ব্যাপারে চীন সতর্ক আছে। তার মানে এই নয় যে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অন্যের কথায় চীন কোনো ধরনের বিরূপ চিন্তা করবে। তিনি আরো বলেন, আকাশসীমা বন্ধের যে প্রশ্ন আসছে তার কোনো রেশ এখনো পাওয়া যায়নি। শুধু লবিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে তারা আকাশপথ বন্ধ করে দিবে বিষয়টি খুব সহজ নয়।

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ আরো বলেন, শুধু করিডোরকে সামনে রেখেই বিভিন্নজন বিভিন্ন আলোচনা বা ষড়যন্ত্র করবে। এমন ষড়যন্ত্র অহরহই হবে। তবে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, এই করিডোর কেন বা কী উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, সেটা পরিষ্কার না। এখানে বাংলাদেশের স্বার্থ কী এবং জাতিসঙ্ঘের স্বার্থ কী- এগুলো পরিষ্কার করা দরকার। হতে পারে, কক্সবাজার বিমানবন্দর ব্যবহার করে জাতিসঙ্ঘ রাখাইনে কোনো মানবিক সহায়তা বা ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে চায়, তাহলে সেটা হতে পারে। কিন্তু করিডোরের নামে সেখানে আরাকান আর্মি বা রাখাইনরা যদি বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ পায়, তাহলে তো দেশের জন্য ভালো কিছু হবে না। দেখতে হবে, ওই করিডোরের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সঙ্কট দূর হবে কি না। যেখানে জাতিসঙ্ঘ নিজেই বলছে আমাদের অর্থ কমে গেছে, রোহিঙ্গাদের আর সহায়তা দিতে পারব না, সেখানে হঠাৎ মানবিক সহায়তার এই অর্থ কোথা থেকে আসছে? জাতিসঙ্ঘে প্রতিনিধিত্বকারী যেসব দেশ আছে তারা এ বিষয়ে কী বলছে, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। দেখা গেল, এই করিডোর সুবিধা দিতে গিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কট ও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সঙ্কট আরো বাড়ল, তখন কী হবে? তাদের (জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মি) লড়াইয়ের মধ্যে আমরা যাতে কোনোভাবে যুক্ত হয়ে না যাই, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। উপদেষ্টা (পররাষ্ট্র) বলেছেন, ‘এই বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে না’, তাহলে আমরা কীভাবে জানব ওই করিডোরে কী হবে? তাই সবার আগে করিডোরের উদ্দেশ্য ও শর্তগুলো পরিষ্কার করা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, আমরা তো আরাকানদের সাথে যুদ্ধে জড়াব না। তাহলে করিডোর বা আকাশসীমা বন্ধের প্রশ্ন কেন আসছে। জাতিসঙ্ঘের যে পাঁচ সদস্য আছে তাদের প্রত্যেকের সম্মতি ও মিয়ানমারের আরাকান আর্মি এবং সংশ্লিষ্টদের সম্মতি থাকলে করিডোরের কথা চিন্তা করা হবে। তার আগে কোনোভাবেই এসব সিদ্ধান্ত সম্ভব না।

মিয়ানমারে ২০২১ সালে বেসামরিক সরকার উৎখাত করে সামরিক শাসন জারি হয়। এরপর থেকেই বিভিন্ন রাজ্যে ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র বিদ্রোহ বা গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। জান্তাবিরোধী ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের’ একটি হলো ‘আরাকান আর্মি’। ২০২৩ সালের অক্টোবরে আরাকান আর্মি জোট ব্যাপক হামলা শুরু করে। চীন সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে সশস্ত্র সংগঠনটি। গত আগস্টে এই জোট উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর লাসিও নিয়ন্ত্রণে নেয়।

বঙ্গোপসাগরের সাথে মিয়ানমারের একটি উপকূলীয় রাজ্য হলো রাখাইন। রাখাইন মূলত রোহিঙ্গা মুসলিমদের আবাসস্থল। জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর গত নভেম্বরে সেখানে লড়াই শুরু হয়েছিল। এর পর থেকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি একের পর এক জয় পেয়ে এখন পর্যন্ত রাখাইন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এমন প্রেক্ষাপটেও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে নানা রকম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

এদিকে ভারত ও লন্ডনে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিরতা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে, তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের জোরপূর্বক প্রবেশ করানোর (পুশ-ইন) চেষ্টাসহ বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

এ ছাড়া, তাদের একটি অংশ চীনের সাথে সমন্বয় করে মিয়ানমারের মাধ্যমে বাংলাদেশের আকাশসীমা বন্ধের উদ্যোগ নিচ্ছে, যার লক্ষ্য করিডোর ইস্যুতে মিয়ানমারকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করা। এই উদ্দেশ্যে তারা একটি লবিস্ট ফার্মকে দায়িত্ব দিয়েছে বলে জানা গেছে। এ সংক্রান্ত তথ্য সম্প্রতি লন্ডনে অবস্থানরত কিছু নেতার ব্যক্তিগত আলাপচারিতা থেকে ফাঁস হয়েছে।