বন্যার আগাম পদধ্বনি : নিঃশব্দ আর্তনাদ ও করণীয়

মন্তব্য প্রতিবেদন

Printed Edition

মীযানুল করীম

বাংলাদেশকে প্রায়শই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের দেশ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এ দেশের মানুষের কাছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং নদীভাঙন একটি নিয়মিত ও সাংবাৎসরিক ব্যাপার। তবে মেঘনা অববাহিকার বন্যা বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় আকস্মিক বন্যা কৃষকের জন্য এক চরম দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়। সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাসে ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মায় বন্যার প্রকোপ বাড়লেও, হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যা শুরু হয় এপ্রিল-মে মাসেই।

ভৌগোলিক বাস্তবতা ও আগাম দুর্যোগ

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়ে নিচু হওয়ায় ভারতের পাহাড়ি ঢল অতি সহজেই বাংলাদেশকে প্লাবিত করে। মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জীতে যখন অতি বৃষ্টি হয়, তখন সেই পানির ঢল সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনার নিম্নাঞ্চলকে নিমিষেই তলিয়ে দেয়। বর্তমানেও সিলেট, সুনামগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে বন্যার আগাম পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। আবহাওয়া পূর্বাভাসের কারণে সামুদ্রিক বন্দরগুলোতে ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা থাকলেও হাওর পাড়ে এখন বইছে হাহাকার।

বিপর্যস্ত বোরো ফসলের ভাণ্ডার

হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। ঋণের বোঝা এবং কঠোর শ্রম দিয়ে ফলানো সেই সোনালি ধান এখন পানির নিচে। সুনামগঞ্জে যেখানে প্রায় দুই লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন, সেখানে মৌসুমের শেষ মুহূর্তে অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

সরকারি হিসেবে ৫৬ শতাংশ ধান কাটার দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে এটি ৩০-৪০ শতাংশের বেশি নয়। জলাবদ্ধতার কারণে আধুনিক ‘কম্বাইন হারভেস্টার’ ব্যবহার করা যাচ্ছে না, আবার শ্রমিক সঙ্কটের কারণে বুকসমান পানিতে ধান কাটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের দ্বিগুণ মজুরি দিতে গিয়ে অনেক কৃষক নিরুপায় হয়ে ধান কাটা বন্ধ রেখেছেন। অনেক স্থানে খলায় রাখা কাটা ধানও পচে নষ্ট হচ্ছে।

আমাদের করণীয়

প্রকৃতির গতিপথ বা ভৌগোলিক অবস্থান আমরা পরিবর্তন করতে পারব না, তবে সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমান সঙ্কটে আমাদের যা করা জরুরি :

বন্যা মনিটরিং ও বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ : নিয়মিতভাবে পানি স্তর পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো দ্রুত মেরামত করতে হবে যাতে নতুন এলাকা প্লাবিত না হয়।

খাল খননের সুফল নিশ্চিত করা : এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল খনন কর্মসূচি কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।

গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা : কেন ঘন ঘন আগাম বন্যা হচ্ছে (যেমন ১৯৮৫, ১৯৯০ বা বর্তমান শতাব্দীর শুরুতে হয়েছিল) তার কারণগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কৃষক সহায়তা : ধান কাটার জন্য জরুরি ভিত্তিতে শ্রমিক সরবরাহ বা প্রতিকূল পরিবেশে ব্যবহারোপযোগী যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আর্থিক প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন।

পরিশেষে, হাওর অঞ্চলের মানুষকে বাঁচাতে হলে কেবল ত্রাণের অপেক্ষা না করে টেকসই কৃষি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। প্রকৃতির এই নির্মম আঘাত সামাল দেয়ার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।