সংসদে আইনমন্ত্রীর তথ্য
আওয়ামী আমলের ২৩ হাজার ৮৬৫ রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার
Printed Edition
সংসদ প্রতিবেদক
রাজনৈতিক কারণে দায়ের করা হয়রানিমূলক মোট ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং বাকিগুলো প্রত্যাহার করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে সংসদকে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। এ ছাড়া তিনি জানান, বিগত (আওয়ামী) সরকারের আমলে সংঘটিত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন থানায় মোট এক হাজার ৮৫৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ২৫তম দিনে টেবিলে উত্থাপিত দু’টি পৃথক প্রশ্নের লিখিত জবাবে আইনমন্ত্রী এ কথা জানান। এ সময় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
পাবনা-৩ আসনের বিরোধী দলের (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য মুহাম্মাদ আলী আছগারের এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, মামলা দায়েরের সময় এজাহারে অভিযুক্তের দলীয় পরিচয় উল্লেখ থাকে না। ফলে সারা দেশে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কতগুলো হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নিরূপণ করা সম্ভব নয় এবং এ-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে নেই। তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক ২০০৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মোট এক লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
মন্ত্রী জানান, ফ্যাসিস্ট আমলে জামায়াতের নেতাকর্মীদের নামে কতটি মামলা দায়ের হয়েছে সে-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৬ সালের ৫ মার্চ রাজনৈতিক কারণে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহারের সুপারিশ করার ল্েয জেলাপর্যায়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সভাপতিত্বে চার সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে। মামলা প্রত্যাহারের আবেদনপত্র, এজাহার এবং প্রযোজ্য েেত্র চার্জশিটের সার্টিফাইড কপি এবং পাবলিক প্রসিকিউটরের মতামত পর্যালোচনা করে মামলাগুলো রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়েছে, জনস্বার্থে মামলা চালানোর প্রয়োজনীয়তা নেই এবং মামলা চালালে রাষ্ট্রের তি হবে মর্মে পরিলতি হলে ওই কমিটি মামলাগুলো প্রত্যাহারের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করবে।
তিনি বলেন, জেলা কমিটির কাছ থেকে পাওয়া সুপারিশগুলো পরীা-নিরীা করে মামলা প্রত্যাহারের কার্যক্রম গ্রহণ করার জন্য সরকার ৮ মার্চ আইনমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যবিশিষ্ট ‘কেন্দ্রীয় কমিটি’ গঠন করে। এ পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক মোট ২৩ হাজার ৮৬৫টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। যেসব হয়রানিমূলক মামলা এখনো প্রত্যাহার হয়নি, সেগুলো প্রত্যাহার করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী হত্যা ও গুমসহ ১,৮৫৫ মামলা দায়ের : কুড়িগ্রাম-১ আসনের বিরোধী দলের (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য মো: আনোয়ারুল ইসলামের টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নের লিখিত জবাবে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান জানান, বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন জেলার থানায় মোট এক হাজার ৮৫৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি বলেন, এসব মামলার মধ্যে ৭৯৯টি হত্যা মামলা এবং অন্যান্য ধারায় এক হাজার ৫৬টি মামলা রুজু হয়েছে।
মো: আসাদুজ্জামান জানান, ইতোমধ্যে ১৫৮টি মামলার তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি হত্যা মামলা এবং ১১০টি অন্যান্য মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং এসব মামলার বিচার কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, বাকি এক হাজার ৬৯৭টি মামলার তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। বিপুলসংখ্যক মামলার তদন্ত একটি জটিল ও সময়সাপে প্রক্রিয়া হলেও দ্রুততম সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের ল্েয পুলিশ বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিটি মামলায় যথাযথ স্যা-প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে, যাতে বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো আইনি দুর্বলতা না থাকে।
জামিন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, জামিন প্রদান সম্পূর্ণরূপে আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। তবে রাষ্ট্রপরে আইনজীবীরা প্রতিটি মামলায় যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে আসামিদের জামিনের বিরোধিতা করছেন। তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময় সংঘটিত নৃশংস অপরাধের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যারা হত্যা, গুম, নির্যাতন বা পঙ্গুত্বের মতো অপরাধে জড়িত, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে।
ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলের অপ্রাসঙ্গিক আইন সংশোধন করা হবে : সংসদ সদস্য মো: ফজলে হুদার প্রশ্নের লিখিত উত্তরে আইনমন্ত্রী জানান, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পর নবগঠিত বাংলাদেশে একটি সুসংহত আইনি কাঠামো গড়ে তোলার ল্েয দ্যা বাংলাদেশ ল’স (রিভিশন অ্যান্ড ডিকারেশন) অ্যাক্ট, ১৯৭৩ প্রণয়ন করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে ২৬ মার্চ, ১৯৭১ তারিখ থেকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রযোজ্য আইনগুলো, রাষ্ট্রপতির আদেশ এবং সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনগুলোকে পুনর্বিবেচনা, সংশোধন ও বাতিলের মাধ্যমে সুসংহত করা হয়। একই সাথে যেসব আইন বাংলাদেশের প্রোপটে অপ্রাসঙ্গিক বা অকার্যকর ছিল, সেগুলো বাতিল করা হয় এবং কিছু আইনকে বাংলাদেশের আইনের অংশ নয় বলে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে, যেসব আইনে সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে, সেগুলো সময়ে সময়ে সংশোধনের মাধ্যমে যুগোপযোগী করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী জানান, নতুন বাস্তবতার প্রয়োজনে বিভিন্ন নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের যেসব আইন বর্তমান প্রোপটে অকার্যকর বা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত গ্রহণপূর্বক সরকার পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় সংশোধন বা নতুনভাবে প্রণয়ন করবে। এ ল্েয ল কমিশন কাজ করছে এবং কমিশন থেকে সুপারিশ প্রাপ্তির পর সরকার তা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।