গ্যাসসঙ্কট সত্ত্বেও শিল্পে অবৈধ সংযোগ বছরে ক্ষতি শতকোটি টাকার

প্রতিদিন যে পরিমাণ গ্যাস অপচয় হয় তা দিয়ে দিয়ে অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ মাঝারি শিল্প কারখানার দৈনিক উৎপাদন চালানো সম্ভব

Printed Edition

শাহ আলম নূর

দেশে তীব্র গ্যাসসঙ্কটের মধ্যেও শিল্প কারখানায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিস্তার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমিত সরবরাহের মধ্যেও অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার চলতে থাকায় একদিকে যেমন সঙ্কট বাড়ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। একই সাথে বৈধ গ্রাহক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।

বাংলাদেশের শিল্প খাত বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল ও কেমিক্যাল শিল্পে গ্যাসের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। এসব শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে রফতানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। শিল্প মালিকরা বলছেন, যখন বৈধ গ্রাহক হিসেবে নির্ধারিত গ্যাস পাওয়া যায় না, তখন কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে সংযোগ নেয়ার পথে হাঁটে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। কিন্তু দেশীয় উৎপাদন ও আমদানিকৃত এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ হচ্ছে গড়ে দুই হাজার ৭৫০ থেকে দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিদিন প্রায় ৯০০ থেকে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে গ্যাস ব্যবহারকারী মোট গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৪৫ লাখের বেশি। এর মধ্যে শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী মোট সরবরাহকৃত গ্যাসের প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ শিল্প খাতে এবং প্রায় ১৭ শতাংশ ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। তবে এই সীমিত সরবরাহের মধ্যেও অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে শিল্পে গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন অভিযানের তথ্য বলছে, প্রতি বছর হাজার হাজার অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। তবুও নতুন করে আবার সংযোগ নেয়ার ঘটনা ঘটছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজধানী ও আশপাশের শিল্প এলাকায় পরিচালিত প্রায় এক হাজার ২০০ অভিযানে প্রায় ছয় হাজারের বেশি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এসব সংযোগের বড় একটি অংশ শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের। একই সময়ে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের দায়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বেশি জরিমানা ও বকেয়া বিল আদায় করা হয়েছে। তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহারের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অপচয় বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ গ্যাস অপচয় হয়ে থাকে তা দিয়ে দিয়ে অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ মাঝারি শিল্প কারখানার দৈনিক উৎপাদন চালানো সম্ভব। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে অবৈধ সংযোগের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত লোডের বাইরে অতিরিক্ত গ্যাস ব্যবহার করছে। আবার কিছু কারখানা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে পাইপলাইন থেকে সংযোগ নিয়ে গ্যাস ব্যবহার করছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিল্প কারখানার ভেতরে গোপনে আলাদা পাইপলাইন বসিয়ে অতিরিক্ত গ্যাস নেয়া হচ্ছে। অনেক সময় মূল মিটারকে বাইপাস করে সরাসরি পাইপলাইন থেকে গ্যাস নেয়ার ঘটনাও ধরা পড়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের কারণে সরকার প্রতি বছর প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারাচ্ছে। কারণ এসব গ্যাসের কোনো বিল পরিশোধ করা হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রে মিটার কারচুপির মাধ্যমে কম বিল দেয়া হয়।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কর্মকর্তারা বলছেন, যদি অবৈধ সংযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়, তাহলে গ্যাস সরবরাহে উল্লেখযোগ্য উন্নতিসহ বৈধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হবে। গ্যাসসঙ্কটের কারণে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, কাচ, স্টিল এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে এর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্যে দেখা যায়, গ্যাসসঙ্কটের কারণে কিছু শিল্প কারখানায় উৎপাদন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক কারখানায় দিনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে মেশিন চালানো সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পে প্রায় চার হাজারের বেশি কারখানা রয়েছে, যাদের বড় অংশই সরাসরি বা ক্যাপটিভ বিদ্যুতের মাধ্যমে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।

দেশের টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ২০১৮ সাল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে। বর্তমানে দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৬৫০ থেকে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেশি হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী আমদানি সব সময় সম্ভব হয় না। ফলে সরবরাহ সঙ্কট থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাসসঙ্কটের এই সময়ে শিল্পে অবৈধ সংযোগ শুধু একটি আইনগত সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সঙ্কট মোকাবেলায় সরকার, শিল্প মালিক এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধ করতে হলে নিয়মিত অভিযান চালানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত নজরদারি বাড়াতে হবে। স্মার্ট মিটার স্থাপন, ডিজিটাল মনিটরিং এবং পাইপলাইন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অবৈধ সংযোগ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।

তিনি বলেন, শিল্পায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে গ্যাস ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধ সংযোগের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এবং গ্যাসের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হতে পারে এই সঙ্কট মোকাবেলার অন্যতম প্রধান উপায় বলে তিনি মনে করেন।