এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি : বাংলা দ্বিতীয় পত্র
ভাবসম্প্রসারণ
Printed Edition
মো. সুজাউদ দৌলা
সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা
সুপ্রিয় এইচএসসি পরীক্ষার শিক্ষার্থী বন্ধুরা, শুভেচ্ছা নিও। আজ তোমাদের বাংলা দ্বিতীয় পত্র বিষয় থেকে আরও ২টি গুরুত্বপূর্ণ ‘ভাবসম্প্রসারণ’ নিয়ে আলোচনা করা হলো।
দুঃখের মতো এত বড় পরশ পাথর আর নাই
ভাবম্প্রসারণ: দুঃখের স্পর্শে মানুষের স্বীয়সত্তা ও অন্তর্গত শক্তি জাগ্রত হয়। দুঃখের মধ্য দিয়েই মানুষ সত্যিকার মনুষ্যত্ব লাভ করে। দুঃখের পরশেই মানুষের বিবেক জাগ্রত হয়।
দুঃখ-কষ্টের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই মানুষের মধ্যে জন্ম নেয় প্রজ্ঞা ও মহত্ত্বের। দুঃখের করুণ দহন শেষে যে সুখ আবির্ভূত হয়, তা অনাবিল ও অতুলনীয়। দুঃখের আগুনই মানুষের মনুষ্যত্ব ও বিবেককে খাঁটি সোনায় পরিণত করে। পৃথিবীর সব মূল্যবান সম্পদ দুঃখের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছে। দুঃখ ছাড়া প্রকৃত সুখ অর্জন সম্ভব নয়। মনীষীরা দুঃখকে পরশপাথরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। পরশপাথরের ছোঁয়ায় লোহা যেমন সোনায় পরিণত হয়, তেমনি দুঃখরূপ পরশপাথরের ছোঁয়ায় মানুষের সব গ্লানি দূর হয়ে যায়। ফলে মানুষ লাভ করে জীবনের সার্থকতা। জগতের সব সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সীমাহীন দুঃখের মর্মান্তিক ইতিহাস। কথিত আছে, ‘কষ্ট ছাড়া কেষ্ট মেলে না।’
দুঃখ-কষ্ট, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অধ্যবসায় ছাড়া জীবনে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে আরোহণ অসম্ভব। মূলত, দুঃখই জগতে একমাত্র সব পদার্থের মূল। মাতৃস্নেহের মূল্য দুঃখে, পতিব্রতের মূল্য দুঃখে, পুণ্যের মূল্য দুঃখে বোঝানো সম্ভব। সুতরাং দুঃখকে বর্জন করা অসম্ভব।
দুঃখ মানুষের সব জড়তা ও দৈন্য দূর করে তাকে সুন্দর করে। দুঃখের ভেতর দিয়েই মানুষ জীবন সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে। সুতরাং জাগতিক সব প্রাপ্তির পূর্বশর্ত দুঃখের পরশ।
দণ্ডিতের সঙ্গে
দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে
সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার।
ভাবসম্প্রসারণ: সভ্য এ পৃথিবীতে বিচারকের মাধ্যমে অপরাধীকে শাস্তি প্রদানের বিধান রয়েছে। যেকোনো শাস্তিই কষ্টদায়ক। সেই কষ্টবোধে বিচারক যদি সংবেদনশীল হন, তবেই সে বিচার মানবিকতাবোধে উজ্জীবিত শ্রেষ্ঠ বিচার বলে অভিহিত হয়।
ন্যায়ের শুভ্র পাষাণবেদীর ওপর বিচারকের আসন পাতা। নিরপেক্ষভাবে অপরাধ নির্ণয় করে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়াই বিচারকের কাজ। এ কাজ অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু অপরাধীকে দণ্ডদানের ব্যাপারে বিচারককে সংবেদনশীল হতে হবে, হতে হবে অনুভূতিপ্রবণ। তা না হয়ে তিনি যদি অপরাধীকে নির্মমভাবে দণ্ডদান করেন, দণ্ডিতের বেদনায় তার হৃদয়ে যদি করুণার উদ্রেক না হয়, তবে তার দণ্ডদান হয় প্রবলের অত্যাচার এবং তিনি হয়ে পড়েন বিচারক পদের অযোগ্য। যে দণ্ডিত, যাকে তিনি দণ্ডদান করলেন, সে অবশ্যই কোনো হতভাগ্য বাবা-মায়ের সন্তান। সন্তানের ব্যথা-বেদনায় তারাও ব্যথিত। তা ছাড়া যেকোনো শাস্তিই কষ্টদায়ক। অপরাধীকে সেই কষ্ট ভোগ করতে হয়। বিচারক যদি তার এবং তার পিতা-মাতার ব্যথা-বেদনার কথা চিন্তা করে ব্যথিত না হন, তাহলে তার শাস্তিদান হবে নিষ্ঠুরতার নামান্তর। কাজেই দণ্ডিতের প্রতি বিচারককে সমব্যথী হতে হবে। সমব্যথী বিচারকের বিচারই সর্বশ্রেষ্ঠ বিচার এবং তিনি যে শাস্তিদান করেন, তা-ই সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্তি।
দণ্ডদাতার মন অপরাধীর জন্য যদি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, তবে তা অপরাধীর হৃদয় এবং বিবেককেও স্পর্শ করবে। সেই সঙ্গে অপরাধী নিজের করা অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হবে এবং তার অন্তরে জাগ্রত হবে পরিশুদ্ধ বিবেক।