৩৮ কার্যদিবস পর ডিএসইর লেনদেন ফের হাজার কোটি টাকা

স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনছে বিএসইসি

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর আবার ইতিবাচক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে দেশের পুঁজিবাজার। গতকাল দুই মাসের বেশি সময় পার করে, যা দিনের হিসাবে ৩৮ কার্যদিবস পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেন হাজার কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করেছে। দেশের প্রধান পুঁজিবাজারটিতে এ দিন ১ হাজার ৫৬ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এর আগে সর্বশেষ ১৭ ফেব্রুয়ারি হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হয়েছিল ডিএসইতে।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও দেশের দুই পুঁজিবাজারের লেনদেন ছিল বেশ আশা জাগানিয়া। এরই ধারাবাহিকতায় হাজার কোটি টাকা ছাড়াল ডিএসইর লেনদেন। যুদ্ধ বিরতির বিষয়ে দুই দেশ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও আরো ভালো আচরণ করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তারা। নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুঁজিবাজারগুলো নেতিবাচক প্রবণতার শিকার। বিশেষ করে বিগত দেড় দশক খোদ পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা পুঁজিবাজারের ওপর দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করে দিয়েছে। এখন নতুন সরকার যত দ্রুত সম্ভব বাজার সংস্কারের বিষয়গুলো আমলে নিলে আবারও দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসতে পারে।

গতকাল টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের উন্নতি ঘটে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪১ দশমিক ১৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৫ হাজার ২৫৭ দশমিক ৪১ পয়েন্ট থেকে সূচকটি দিনশেষে পৌঁছে গিয়েছিল ৫ হাজার ২৯৮ দশমিক ৫৮ পয়েন্টে। তবে লেনদেন শুরুর এক ঘণ্টার মাথায় সূচকটি একবার পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৩২০ পয়েন্টে। এ সময় ডিএসই সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৬২ পয়েন্টের বেশি। মাঝখানে কিছু সময়ের জন্য বিক্রয়চাপের মধ্যে কাটালেও দুপুর পৌনে একটার দিকে আবারো একই অবস্থানে পৌঁছে সূচকটি। কিন্তু বেলা দেড়টার পর বিক্রিয়চাপ বাড়লে শেষ দিকে সূচকের আরো অবনতি ঘটে। দিন শেষে সূচকটির উন্নতি ৪১ দশমিক ১৬ পয়েন্ট টিকে থাকে।

একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ২০ দশমিক ৩২ ও ৩ দশমিক ২৩ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৬০ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। বাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১০৩ দশমিক ৮৪ ও ৩৬ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট।

এ দিকে শেয়ারবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং তহবিলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডের (সিএমএসএফ) ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সম্প্রতি কমিশনের এক সভায় তহবিলের নিরাপত্তা জোরদার ও ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রথমেই সিএমএসএফের প্রধান ব্যাংক হিসাবটি কোনো বেসরকারি ব্যাংক থেকে সরিয়ে একটি সরকারি তফসিলি ব্যাংকে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরো দু’টি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো :

এক্সিম ব্যাংক থেকে আমানত প্রত্যাহার : বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ ফেরত আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আইসিবি থেকে বিনিয়োগ ফেরত : ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশে (আইসিবি) বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পেতে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বা রোডম্যাপ দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান কমিশন সিএমএসএফের কার্যক্রমে বেশ কিছু অনিয়ম খুঁজে পায়। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি শক্তিশালী সংবিধিবদ্ধ কাঠামো দিতে নতুন আইন প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী তহবিলের সাত সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হবেন বিএসইসির চেয়ারম্যান। বোর্ডে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, দুই স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান, আইসিবির চেয়ারম্যান ও তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রতিনিধি হিসেবে থাকবেন।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, আমানত বৈচিত্র্যকরণ এবং সরকারি ব্যাংকের অধীনে তহবিল পরিচালনার ফলে ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে। ২০২১ সালে শেয়ারবাজারের উন্নয়ন ও তারল্য সঙ্কট মেটাতে ২০ হাজার কোটি টাকার এই ফান্ড গঠিত হয়েছিল। বর্তমানে এই সংস্কার উদ্যোগগুলো বিনিয়োগকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গতকাল বাজারের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগই মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় ছিল। আবার আগের কয়েক দিন মূল্যবৃদ্ধি ঘটা কিছু কিছু কোম্পানির দরপতনের ঘটনাও ঘটে। প্রধান প্রধান খাতগুলোর বেশির ভাগ কোম্পানিই এ সময় মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় উঠে আসে। এদের মধ্যে ছিল ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সিমেন্ট, ওষুধ ও রসায়ন, বিবিধ, টেলিকমিউনিকেশন ও টেক্সটাইল। অপর দিকে দর পতনের শিকার ছিল সিরামিকস, প্রকৌশল, খাদ্য ও জ¦ালানি খাত।

মঙ্গলবারের মতো ঢাকা স্টকে গতকালও লেনদেনের শীর্ষে ছিল সিটি ব্যাংক। ২৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৮৩ লাখ ৯৪ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় কোম্পানিটির। ২৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় ৪৪ লাখ ৮৩ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে প্রকৌশল খাতের কোম্পানি ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট। একমি পেস্টিসাইডস, মুন্নু ফেব্রিক্স, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, লাভেলো আইসক্রিম, অগ্নি সিস্টেমস, সিমটেক্স ও পিপলস ইন্স্যুরেন্স।