ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধ

বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার

শাহ আলম নূর
Printed Edition
Cotton

সরকার ভারত থেকে স্থলপথে সুতা আমদানি বন্ধ করায় দেশের টেক্সটাইল ও তৈরী পোশাক খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই খাত নতুন করে শ্বাস ফেলার সুযোগ পেয়েছে বলে সংশ্লিøষ্টরা মনে করছেন। দীর্ঘ দিন ধরেই দেশীয় স্পিনিং মিল মালিকরা সুতা আমদানির কিছু অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন। দেশের উদ্যোক্তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়ায় দেশীয় উৎপাদকরা আশার আলো দেখছেন বলে এ খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন।

বাংলাদেশে তৈরী পোশাকশিল্প (আরএমজি খাত) দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি অবদান রেখে থাকে। এই বিশাল শিল্পের কাঁচামালের বড় একটি অংশ হচ্ছে সুতা। দেশে অনেক স্পিনিং মিল থাকলেও বিভিন্ন কারণে বহু প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে সুতা আমদানি করত। কারণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য ছিল সস্তা দামে সুতা পাওয়া, দ্রুত ডেলিভারি সুবিধা এবং স্থলপথে কম খরচে পণ্য আনার সুযোগ।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন বাস্তবতা হচ্ছে, ভারত থেকে আমদানির ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম ও মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে উচ্চ মানের সুতা কম শুল্কে আমদানি করা হতো। এতে করে সরকারের রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদকরাও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিলেন। স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছিল না। ফলে মিলগুলো লোকসানের মুখে পড়ছিল এবং অনেক মিল কার্যক্রম বন্ধও করে দিতে বাধ্য হচ্ছিল।

বাংলাদেশে মূলত স্পিনিং মিলগুলো সুতা উৎপাদন করে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪৫০টির বেশি স্পিনিং মিল রয়েছে, যার বেশির ভাগই বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর সদস্য। বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলোর বার্ষিক সুতা উৎপাদন সক্ষমতা ১৫-২০ লাখ টন। প্রতি মাসে প্রায় ১.২ থেকে ১.৬ লাখ টন সুতা উৎপাদন করার সক্ষমতা রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে চার-পাঁচ হাজার টন সুতা উৎপাদন করতে সক্ষমতা রয়েছে দেশের টেক্সটাইল মিলগুলোর। এ দিকে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকশিল্পে সুতার চাহিদা মোটামুটি বছরে ২৮-৩০ লাখ টনের মতো। এর মধ্যে প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ চাহিদা স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো থেকেই পূরণ হয়। বাকি ৩০-৪০ শতাংশ সুতা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বিশেষত ভারত, চীন, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা হয়। বিশেষ করে কটন ব্লেন্ডেড, সিন্থেটিক ও বিশেষ ধরনের সুতা।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) দীর্ঘ দিন ধরেই এই বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছিল। তাদের মতে, দেশে পর্যাপ্ত স্পিনিং মিল থাকলেও ভারত থেকে আমদানির কারণে তারা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছিল না। অবশেষে সরকার বিষয়টি আমলে নিয়ে ১৫ এপ্রিল ২০২৫ থেকে ভারত থেকে স্থলপথে সুতা আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত থেকে সুতা আমদানির পথ বন্ধ হতেই দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৫১৯টি স্পিনিং মিল রয়েছে। এদের অধিকাংশই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সুতা উৎপাদনে সক্ষম। তবে বিগত সময়ে তাদের উৎপাদন ক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত ছিল।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর সভাপতির শওকত আজিজ রাসেল নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় শিল্পের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। দেশীয় মিলগুলো এখন তাদের উৎপাদন বাড়াচ্ছে, নতুন শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছে এবং রফতানিমুখী পোশাক খাতেও সাপোর্ট দিতে পারছে।তিনি বলেন, স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর মালিকরাও সরকারের এমন সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট। এতদিন কম দামে ভারতীয় সুতা বাজার দখল করছিল; কিন্তু এখন স্থানীয় মিলগুলো প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আসতে পারছে এবং সুতা উৎপাদনে আত্মনির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান।

স্থানীয় সুতা উৎপাদন বাড়ার ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। সারা দেশে অনেক স্পিনিং মিল থাকার কারণে চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে করে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে তিনি জানান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কর্মসংস্থানই নয়; বরং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে। আগের তুলনায় কম পরিমাণে সুতা আমদানি করতে হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। একই সাথে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। কারণ শুল্ক ফাঁকির সুযোগ কমে এসেছে। তবে এই সিদ্ধান্তে সবাই যে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট তা নয়। বিশেষ করে তৈরী পোশাকশিল্পের রফতানিকারকরা কিছুটা উদ্বিগ্ন। কারণ তাদের মতে, ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধ হওয়ায় উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। সমুদ্রপথে সুতা আমদানিতে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, সেই সাথে ডেলিভারিতে সময়ও বেশি লাগে।

প্লমি ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, ভারত থেকে স্থলপথে সুতা আমদানি বন্ধ হওয়ায় এখন কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে। দ্রুত সাপ্লাইয়ের জন্য ভারত ছিল সুবিধাজনক। তবে এখন আমাদের সমুদ্রপথে আসতে হচ্ছে, এতে খরচ কিছুটা বাড়ছে।

এ দিকে সরকার বলছে, এই খরচ সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল হবে। তা ছাড়া যারা আমদানি করতে চান, তারা বিকল্প উৎস যেমন চীন, উজবেকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সুতা সংগ্রহ করতে পারবেন। সরকারও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। বিকল্প উৎস থেকে সুতা আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। একই সাথে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য উদ্যোক্তাদের নানা প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ঋণসুবিধা দেয়া হচ্ছে। টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলগুলোর প্রযুক্তি হালনাগাদে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক মানের সুতা উৎপাদনে সক্ষম হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে, মিথ্যা ঘোষণা, শুল্ক ফাঁকি ও অনিয়ম রোধ করতে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই সাথে দেশের স্বার্থ রক্ষা করাই এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের সুফল বয়ে আনবে। দেশীয় টেক্সটাইল খাত আরো শক্তিশালী হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং রফতানি আয় আরো বাড়বে। দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো যখন পূর্ণ উৎপাদনে কাজ করবে তখন বিদেশী মুদ্রার ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।

টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, স্বল্পমেয়াদে কিছু অসুবিধা হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই সিদ্ধান্ত দেশের শিল্প বিকাশে বড় ভূমিকা রাখবে। দেশীয় উৎপাদন বাড়লে ভবিষ্যতে আমরা নিজেরাই প্রয়োজনীয় সুতা জোগান দিতে পারব। ভারত থেকে স্থলপথে সুতা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের টেক্সটাইল শিল্পে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের শিল্পায়নে মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।