যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে শুরু হতে পারে আঞ্চলিক যুদ্ধ : খামেনি

Printed Edition
onno-1
যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে শুরু হতে পারে আঞ্চলিক যুদ্ধ : খামেনি

এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ‘আঞ্চলিক যুদ্ধ’ শুরু হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। রোববার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সতর্ক করে বলেন, আমেরিকা আক্রমণ করলে ‘আঞ্চলিক যুদ্ধ’ শুরু হতে পারে। আমেরিকানদের জানা উচিত যে, তারা যদি যুদ্ধ শুরু করে, তাহলে এবার আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হবে।

এর আগে ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তীব্র উত্তেজনার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়ে অগ্রগতি হচ্ছে। শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে এই তথ্য জানান। আলি লারিজানি এক পোস্টে লিখেছেন, গণমাধ্যমের সৃষ্ট ‘মিথ্যা যুদ্ধাবস্থার’ বিপরীতে আলোচনার কাঠামো গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। তবে তিনি আলোচনার এই সম্ভাব্য ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।

অপর দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান সামরিক পদক্ষেপের মুখে না পড়ে চুক্তি করতে চায় বলেই তিনি বিশ্বাস করেন। ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, ইরান আমাদের সাথে কথা বলছে, দেখি আমরা কিছু করতে পারি কি না; না পারলে যা হওয়ার হবে। আমাদের বিশাল নৌবহর সেখানে যাচ্ছে। তিনি আরো যোগ করেন, তারা (ইরান) আলোচনায় বসছে।

হরমুজ প্রণালীতে ইরানি বাহিনীর যুদ্ধ মহড়া

এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানে অতর্কিত হামলা চালাবেন বলে বারবার হুমকি দিয়েই চলেছেন, তখন পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান। একাধিক মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, রোববার থেকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নেতৃত্বাধীন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে নৌযুদ্ধের মহড়া শুরু করেছে। তেহরানের এমন পদক্ষেপে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল মার্কিন বিমানবাহীর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। এ ছাড়া এই রণতরীর সঙ্গী তিনটি আর্লে বার্ক-শ্রেণীর ডেস্ট্রয়ারও পশ্চিম এশিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। গত সপ্তাহে এসব বহর ইরান উপকূলের অদূরে ঘাঁটি গেড়েছে।

এমন থমথমে আবহে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পথে হাঁটল ইরান। তেহরান শনিবার রাতে ঘোষণা করে, রোববার ও সোমবার হরমুজ প্রণালীতে ‘লাইভ ফায়ার ড্রিল’ (সরাসরি গোলাবর্ষণ মহড়া) চালানো হবে। সামরিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ইরানের নজর হরমুজে থাকার প্রধান কারণ হলো- এটি এমন এক সঙ্কীর্ণ জলপথ, যেখানে সামান্য অস্থিরতায় বিশ্বজ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক নৌপথ পরিবহন ব্যবস্থায় আঘাত হানতে পারে। সেই কৌশলগত অবস্থানের সুযোগ নিয়েই পাল্টা আগ্রাসনের পথে হাঁটছে খামেনির দেশ।

তবে শুক্রবার মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) হরমুজ প্রণালীতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) দুই দিনের নৌমহড়া পরিকল্পনা নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। সেন্টকম জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী, আঞ্চলিক অংশীদার বা বাণিজ্যিক জাহাজের কাছাকাছি কোনো অনিরাপদ বা অপেশাদার আচরণ সংঘর্ষ, উত্তেজনা বৃদ্ধি ও অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়ায়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি শনিবার পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ইরানের উপকূলে কার্যরত মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্রবাহিনী কিভাবে নিজেদের ভূখণ্ডে মহড়া চালাবে, সেই নির্দেশ দিতে চাইছে। আরাকচি আরো লেখেন, যে একই মার্কিন সরকার আইআরজিসিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, সেই সরকারই আবার সেই ‘সন্ত্রাসী সংগঠনের’ সামরিক মহড়াকে স্বীকৃতি দিয়ে ‘পেশাদারিত্ব’ দাবি করছে!

পরমাণু অস্ত্র ছাড়াই আত্মরক্ষায় সক্ষম ইরান

ইরানের পরমাণু সংস্থার প্রধান মোহাম্মাদ ইসলামি বলেছেন, দেশটির সামরিক নীতিতে পরমাণু অস্ত্রের কোনো স্থান নেই এবং এসব অস্ত্র ছাড়াই ইরান নিজেকে রক্ষা করতে সম্পূর্ণ সক্ষম। শনিবার স্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পরমাণু অস্ত্রের কোনো প্রয়োজন নেই এবং পরমাণু বোমা ছাড়াই তাদের প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ সক্ষমতা রয়েছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেছিলেন, সঙ্ঘাত এড়াতে তাদের পরমাণু উচ্চাকাক্সক্ষা ত্যাগ করতে হবে। একই সাথে তিনি জানান, একটি বিশাল নৌবহর বর্তমানে দেশটির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

২০২৫ সালের জুন মাসে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের পরমাণু স্থাপনায় বোমা হামলাকে ‘নজিরবিহীন’ বলে বর্ণনা করেন ইসলামি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসঙ্ঘের সনদ অনুযায়ী পরমাণু স্থাপনায় হামলা নিষিদ্ধ। তিনি জানান, বোমা হামলার শিকার সব স্থাপনাই আইএইএর কাছে নিবন্ধিত এবং জাতিসঙ্ঘের এই সংস্থার ‘কঠোর তত্ত্বাবধানে’ রয়েছে।

এই কর্মকর্তা জানান, ইরান এখনো পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী দেশ এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা মেনে চলে। তবে পরমাণু স্থাপনা ও কর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানের পার্লামেন্ট আইএইএর সাথে সহযোগিতা স্থগিত করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর পরিদর্শন বন্ধ থাকলেও অক্ষত স্থাপনাগুলোতে তা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। হামলার পর আইএইএ কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন সক্রিয় হুমকির সম্মুখীন হচ্ছি; ইসরাইলি ও মার্কিন কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে আমাদের হুমকি দিচ্ছেন। আমরা যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে আছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই, আমরা এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা ও অনুমোদন করেছি এবং তা কঠোরভাবে মেনে চলছি।’ পরমাণু সংস্থার প্রধান আইএইএকে তাদের সংবিধি অনুযায়ী ‘পেশাদার ও স্বাধীনভাবে কাজ করার’ এবং পরমাণু স্থাপনায় হামলা হলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে তা স্পষ্ট করার আহ্বান জানান। আগামী মার্চে আইএইএর বোর্ড অব গভর্নরসের বৈঠকের দিকে ইঙ্গিত করে ইসলামি ইরানের ওপর চাপ বাড়ার এবং বিষয়টি জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর আশঙ্কার কথা জানান।