নতুন উদ্যোক্তা তৈরি কমে যাওয়ায় দেশে আয় বৈষম্য বেড়েছে : বাণিজ্যমন্ত্রী

Printed Edition
back-3
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসএমই ফাউন্ডেশন আয়োজিত মাইকো স্মল এন্ড মিডিয়াম সাইজড এন্টারপ্রাইজ ডে ২০২৬ উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটির পোর্টালের উদ্বোধন করেন : পিআইডি

বিশেষ সংবাদদাতা

দেশে গত ১২ থেকে ১৫ বছরে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় আয় বৈষম্য বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন শিল্প, বাণিজ্য ও বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে নতুন উদ্যোক্তা খুব কম তৈরি হয়েছে। যারা আগে থেকেই শিল্প-কারখানার মালিক ছিলেন, তারাই মূলত আরো বড় হয়েছেন। আর এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল গ্যাসের অপ্রতুলতা।

গতকাল রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এ বছরের আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবসের প্রতিপাদ্য ‘এআইনির্ভর ভবিষ্যতে মানুষমুখী অন্তর্ভুক্তি : আগামী প্রজন্মের এমএসএমই খাতের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন’ বিষয়ে মন্ত্রী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উদ্যোক্তা উন্নয়ন অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেন।

শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন উইম্যান অন্ট্রাপ্রেনিউরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি নাসরীন ফাতেমা আউয়াল, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বাংলাদেশের প্রধান ম্যাক্স টুনন, এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে দু’টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের নাজিম আহমেদ সাত্তার ও বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফেরদৌস আরা বেগম। এর আগে দিবসটি উপলক্ষে এক বর্ণাঢ্য র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়।

শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশে যে হারে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী ১০-১৫ বছরে সেই অনুপাত ড্রাস্টিক্যালি (তীব্রভাবে) কমে এসেছে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবাহ নির্দিষ্ট কিছু হাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এটি আয় বৈষম্য বাড়ার একটি প্রধান কারণ এবং আমরা সেটিই অনুসরণ করেছি। ফলে ১৫-২০ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে আয় বৈষম্য অনেক বেড়েছে।

আয় বৈষম্যের বৈশ্বিক সূচকের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘ইনকাম ডিসপারিটির স্কেল শূন্য থেকে এক পর্যন্ত। সূচক যত উপরের দিকে যায়, বৈষম্য তত বাড়ে। আমাদের এখানে এই বৈষম্য এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে তুলনা করে আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এমনকি ভারত-পাকিস্তানের জিডিপিতে এমএসএমই খাতের অবদান আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের জিডিপিতে এই খাতের অবদান মাত্র ২৫ শতাংশ। আমরা এটাকে আরো বাড়াতে চাই। কারণ অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ গতিশীল রাখতে এমএসএমই খাতকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।

নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, আমরা একটি ব্রড-বেইজড (সুদূরপ্রসারী) প্ল্যান নিয়ে এগোচ্ছি। নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করা হচ্ছে। বিসিকের মাধ্যমে পাবনা, সিলেট ও নীলফামারীর সৈয়দপুরে নতুন শিল্প পার্ক স্থাপনের প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া যেসব শিল্প পার্কে প্লট শেষ হয়ে গেছে, সেখানে নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি করে আরো পার্ক করা হবে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আমরা কম জ্বালানি কনজিউম করা শিল্পের দিকে বেশি নজর দেবো। আর বর্তমানে যেসব কল-কারখানা গ্যাস সঙ্কটে ভুগছে, সেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে সঙ্কট সমাধানে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি।

ওয়েব সভাপতি নাসরীন ফাতেমা আউয়াল বলেন, দেশের প্রায় এক কোটি পুরুষ উদ্যোক্তার বিপরীতে নারী-উদ্যোক্তার সংখ্যা মাত্র প্রায় সাত লাখ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নারী-উদ্যোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে কর্মসংস্থান বাড়ে, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি পায়, শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নত হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়। তাই নারী-উদ্যোক্তা উন্নয়ন মানেই জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বৈষম্য হ্রাস এবং অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে আরো একধাপ অগ্রগতি।

শিল্পসচিব আব্দুন নাসের বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়, এসএমই খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। এই খাতের উন্নয়নে এমএসএমই নীতিমালা ২০২৬ মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এসএমই ফাউন্ডেশন প্রায় ২২ লক্ষাধিক উদ্যোক্তাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সেবা প্রদান করেছে, যাদের মধ্যে আড়াই লক্ষাধিক সরাসরি সুবিধাভোগী উদ্যোক্তা এবং ৬০ শতাংশ নারী-উদ্যোক্তা। এসএমই ফাউন্ডেশন ২০০৯ সাল থেকে ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা প্রায় ১৫ হাজার উদ্যোক্তার মাঝে বিতরণ করেছে, যাদের অন্তত ২৫ শতাংশ নারী-উদ্যোক্তা।