ন্যাটো নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে ইউরোপ

ট্রাম্প যখন ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেন, তখন থেকেই এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়

Printed Edition

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

আমেরিকা যদি ন্যাটো ছেড়ে যায়, তবে বিকল্প হিসেবে ন্যাটোর বর্তমান সামরিক কাঠামোর ভেতরেই ইউরোপ যাতে আত্মরক্ষা করতে পারে, সেই লক্ষ্যে একটি ‘ফলব্যাক প্ল্যান’ বা বিকল্প পরিকল্পনা জোরদার হচ্ছে। দীর্ঘদিনের বিরোধিতাকারী জার্মানি এই ভাবনায় সায় দেয়ার পর বিষয়টি এখন গতি পেয়েছে।

পরিকল্পনার সাথে যুক্ত কর্মকর্তারা একে ‘ইউরোপীয় ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তারা চাইছেন ন্যাটোর কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণমূলক পদগুলোতে আরো বেশি ইউরোপীয়দের বসাতে এবং মার্কিন সামরিক সম্পদের অভাব নিজেদের সরঞ্জাম দিয়ে পূরণ করতে।

ন্যাটোর ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা ও নৈশভোজের বৈঠকে এই পরিকল্পনাগুলো এগোচ্ছে। অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, বর্তমান জোটের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য নয়; বরং লক্ষ্য হলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা, কাজের ধারাবাহিকতা এবং পারমাণবিক বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা। এমনকি যদি ওয়াশিংটন ইউরোপ থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয় কিংবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকি অনুযায়ী তাদের রক্ষায় অস্বীকৃতি জানায়, তাতেও যেন ন্যাটোর কাঠামো স্থবির না হয়ে পড়ে।

গত বছর প্রথম পরিকল্পিত এই উদ্যোগটি মার্কিন নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ইউরোপের গভীর উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ। ট্রাম্প যখন ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেন, তখন থেকেই এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধে সমর্থন দিতে ইউরোপের অস্বীকৃতি জানানো নিয়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে এই পরিকল্পনা নতুন করে জরুরি হয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বার্লিনের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন এই উদ্যোগকে গতি দিয়েছে। কয়েক দশক ধরে জার্মানি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ইউরোপীয় সার্বভৌমত্ব বৃদ্ধির ফরাসি আহ্বানকে উপেক্ষা করে আসছিল; তারা আমেরিকাকেই ইউরোপীয় নিরাপত্তার মূল জামিনদার হিসেবে রাখাকে অগ্রাধিকার দিত। কিন্তু চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ ম্যার্ৎজের অধীনে সেই অবস্থানে পরিবর্তন আসছে। ট্রাম্পের শাসনামল এবং পরবর্তী সময়ে মিত্র হিসেবে আমেরিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ম্যার্ৎজের উদ্বেগের কারণেই এই পরিবর্তন বলে জানা গেছে।

তবে এই চ্যালেঞ্জ বিশাল। ন্যাটোর পুরো কাঠামোটি লজিস্টিকস এবং গোয়েন্দা তথ্য থেকে শুরু করে শীর্ষ সামরিক কমান্ড পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি স্তরেই মার্কিন নেতৃত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ইউরোপীয়রা এখন সেই দায়িত্বগুলোর বড় অংশ নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়ার চেষ্টা করছে। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই এই বিষয়টি দাবি করে আসছিলেন। জোটের মহাসচিব মার্ক রুটে সম্প্রতি বলেছেন, ন্যাটো হবে ‘আরো বেশি ইউরোপীয় নেতৃত্বাধীন।’

তফাত হলো, আগে আমেরিকার চাপে বাধ্য হয়ে যা করা হতো, এখন ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান শত্রুভাবাপন্ন আচরণের কারণে ইউরোপীয়রা নিজেদের উদ্যোগেই সেই পদক্ষেপ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের ‘কাপুরুষ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং ন্যাটোকে ‘কাগুজ বাঘ’ বলেছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের কথা উল্লেখ করে তিনি আরো যোগ করেন, ‘পুতিনও তা জানেন।’

ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব এই পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপের দিকে দায়িত্ব স্থানান্তরের বিষয়টি চলমান এবং এটি আমেরিকার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবেই চলতে থাকবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এটি বোঝা যে পরিবর্তনটি ঘটছে এবং আমেরিকার আকস্মিক সেনা প্রত্যাহারের চেয়ে একে একটি নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত উপায়ে সম্পন্ন করা জরুরি।’ চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প তার ইরান অভিযানে সমর্থন না দেয়ায় ন্যাটো ছাড়ার হুমকি দিয়েছিলেন। জোট থেকে যেকোনো ধরনের প্রত্যাহারের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হলেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি ইউরোপ থেকে সেনা বা সামরিক সম্পদ সরিয়ে নিতে পারেন অথবা সহায়তা বন্ধ করে দিতে পারেন।

ট্রাম্পের এই হুমকির পরপরই স্টাব তাকে ফোন করে ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করেন। স্টাব বলেন, ‘আমাদের আমেরিকান বন্ধুদের প্রতি মূল বার্তাটি হলো কয়েক দশক পর এখন সময় এসেছে ইউরোপের নিজের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্য আরো দায়িত্ব নেয়ার।’

ইউরোপের জন্য এই পরিবর্তনের মূল অনুঘটক ছিল বার্লিনের ঐতিহাসিক অবস্থান বদল। জার্মানি মার্কিন পারমাণবিক অস্ত্রের আধার এবং তারা দীর্ঘকাল আমেরিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এড়িয়ে চলেছে। জার্মানরা ভয় পেত যে, ন্যাটোর ভেতরে ইউরোপীয় নেতৃত্বকে উৎসাহিত করলে তা আমেরিকাকে তার ভূমিকা কমানোর অজুহাত তৈরি করে দিতে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত বছরের শেষের দিকে ম্যার্ৎজ তার দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন শুরু করেন। তিনি বুঝতে পারেন যে, ট্রাম্প ইউক্রেনকে পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত। ম্যার্ৎজের আশঙ্কা ছিল, ট্রাম্প যুদ্ধের ক্ষেত্রে শিকার এবং আক্রমণকারীর মধ্যে পার্থক্য গুলিয়ে ফেলছেন এবং ন্যাটোর ভেতরে মার্কিন নীতির কোনো স্পষ্ট মূল্যবোধ আর অবশিষ্ট নেই। তা সত্ত্বেও জার্মান নেতা প্রকাশ্যে এই জোট নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাননি। কারণ, সেটি বিপজ্জনক হতো। পরিবর্তে, ইউরোপীয়দের বড় ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আদর্শগতভাবে তারা চায় আমেরিকা জোটেই থাকুক, কিন্তু প্রতিরক্ষার মূল ভারটি ইউরোপীয়দের হাতে ছেড়ে দেয়া হোক।

জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস বলেছেন, ন্যাটোর ভেতরে বর্তমান আলোচনাগুলো সবসময় সহজ নয়। তবে এগুলো যদি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায় তবে তা ইউরোপের জন্য সুযোগ তৈরি করবে। তিনি ন্যাটোকে ‘ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের জন্যই অপরিহার্য’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘তবে এটিও স্পষ্ট যে আমাদের ইউরোপীয়দের নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য আরো দায়িত্ব নিতে হবে এবং আমরা তা করছি। আটলান্টিকপাড়ের সম্পর্ক বজায় রাখতে ন্যাটোকে আরো বেশি ইউরোপীয় হতে হবে।’

জার্মানির এই পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, নর্ডিক দেশসমূহ এবং কানাডাসহ অন্যদের মধ্যে একটি বৃহত্তর ঐক্য তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, তারা এখন এই আপৎকালীন পরিকল্পনাকে ন্যাটোর ভেতরে একটি ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ বা স্বেচ্ছাসেবী জোট হিসেবে দেখছেন।

বার্লিন সম্মতি দেয়ার পরই কেবল ব্যবহারিক সামরিক প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়; যেমন যদি মার্কিন কর্মকর্তারা সরে দাঁড়ান, তবে ন্যাটোর আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, পোল্যান্ড এবং বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোতে শক্তিবৃদ্ধির করিডোর, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এবং বড় আঞ্চলিক মহড়াগুলো কে পরিচালনা করবে? কর্মকর্তারা বলছেন, এগুলোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মকর্তারা আরো জানান, এই পরিকল্পনার সাফল্যের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা বা ‘ড্রাফট’ আবার চালু করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। স্নায়ুযুদ্ধের পর অনেক দেশ এটি বন্ধ করে দিয়েছিল। ফিনল্যান্ডে এটি এখনো চালু আছে। এ প্রসঙ্গে স্টাব বলেন, ‘আমি অন্য কোনো দেশকে পরামর্শ দেব না, তবে নাগরিক শিক্ষা, জাতীয় পরিচয় এবং জাতীয় সংহতির ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার চেয়ে ভালো কিছু সম্ভবত নেই।’