জীবিকার তাগিদে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করাই যেন বিড়ম্বিত শ্রমিকদের নিয়তি

Printed Edition

সিলেট ব্যুরো

  • নির্মাণ ঠিকাদারদের লোভের বলি শ্রমজীবী হতদরিদ্র মানুষ
  • দুই বড় দুর্ঘটনায় ২২ জনের প্রাণহানি

নির্মাণ শ্রমিকদের এ যেন এক সংগ্রামী জীবন। স্ত্রী সন্তানকে সাথে নিয়ে কখনো হয়না সকালের নাশতা করা। ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘর ছাড়েন তারা। জড়ো হন সিলেট নগরীর আম্বরখানা ও বন্দরবাজার এলাকায়। ঠিকাদাররাও শ্রমিকের সন্ধানে জড়ো হন সেসব এলাকায়। দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক নেন ঠিকাদাররা। আর এসব নির্মাণ ঠিকাদারদের লোভের বলি হয়ে জীবন বিলিয়ে দিতে হয় হতভাগ্য মানুষকে।

রোববার ভোরেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক হয়ে ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজারের উদ্দেশে রওয়ানা দেন ২০ জনের মতো শ্রমিক। দক্ষিণ সুরমার তেলিবাজারে ট্রাক-পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল আটজনের। আটজন শ্রমিকের এমন করুণ মৃত্যুতে স্তব্ধ গোটা সিলেট। পরিবারের উপার্জনকারী এসব মানুষকে হারিয়ে দিশেহারা স্ত্রী-সন্তানরা।

জানা গেছে, আম্বরখানা থেকে গোয়ালাবাজারে যাচ্ছিলেন এসব শ্রমিক। সেখানে একটি বাড়ির ছাদের ঢালাই কাজে যোগ দেয়ার কথা ছিল তাদের।

দুর্ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন পুলিশ সদস্য রণজিৎ তালুকদার। তার চোখের সামনেই দুর্ঘটনাটি ঘটে।

সেই দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, তেলিবাজার এলাকায় মারকাজ পয়েন্টে পিকআপ ভ্যানকে ধাক্কা দেয় কাঁঠাল বহনকারী ট্রাক। ধাক্কায় আট থেকে ৯ জন মানুষ পিকআপ থেকে ছিটকে পড়ে বিভিন্ন দিকে। তাদের মধ্যে দু’জন নারীও ছিলেন। এরপর নিজে ভূমিকা নিয়ে ঘাতক ট্রাককে আটক করে পুলিশের ৯৯৯-এ কল দিয়ে থানায় জানান রণজিৎ। দুর্ঘটনার কারণও অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন এই পুলিশ সদস্য। তার মতে, চালক নয়, ট্রাক চালাচ্ছিলেন হেলপার। চোখ দেখে মনে হয়েছে তার চোখ ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন ছিল। সিলেটে শ্রমিকদের এমন মৃত্যুর মিছিল নতুন নয়। কেবল নিহতের সংখ্যা বেশি হয়ে গেলে হইচই পড়ে। ২০২৩ সালের ৭ জুন ভোরে ডিআই ট্রাকে করে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার সময় সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন ১৪ জন শ্রমিক।

দুই দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উভয় ক্ষেত্রেই ডিআই ট্রাকে শ্রমিকদের পাশাপাশি নির্মাণকাজের যন্ত্র মিক্সার মেশিন তোলা হয়েছিল। একটি ডিআই ট্রাকে মিক্সার মেশিন তোলার পর যে ফাঁকা অংশ থাকে সেখানে সাত-আটজন মানুষের জায়গা থাকে। অথচ দুর্ঘটনা দু’টির ক্ষেত্রে ২০ জনের বেশি শ্রমিককে ডিআই ট্রাকে তোলা হয়েছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। নগরের লোহারপাড়া এলাকার একটি কলোনিতে থাকেন সুরুজ মিয়া। দীর্ঘ দিন ধরে তিনি নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, সকালে আমরা কাজের সন্ধানে আম্বরখানায় জড়ো হই। সেখান থেকেই বিভিন্ন সাইটের ঢালাইকাজের জন্য আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায়ই দূর-দূরান্তে কাজে যেতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ডিআই ট্রাকে মিক্সার মেশিন তোলার পর জায়গা আর কতটুকু থাকে অনুমান করেন। সেই জায়গায় ২০ থেকে ৩০ জন শ্রমিককে গাদাগাদি করে উঠতে হয়। তখন আর নিজেকে মানুষ মনে হয় না। সকালের রাস্তা ফাঁকা থাকে, চালকও বেপরোয়া গতিতে চালান। প্রতি মুহূর্তে দুর্ঘটনার ভয় নিয়ে সময় পার করতে হয় আমাদের।

এ বিষয়ে একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করে বলেন, এটা তো নতুন কিছু নয়। সবসময় এভাবেই আমরা ঢালাইয়ের কাজে নিয়ে যাই। মাঝে মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে। প্রতিদিন ঘটলে না হয় আমাদের দোষ।

এ বিষয়ে নির্মাণ ব্যবসায়ী মঞ্জুর মোহাম্মদ বলেন, সকালে আম্বরখানা বা যেসব জায়গায় শ্রমিকরা জড়ো হন, সেখানে গেলেই দেখবেন ঢালাইকাজে এসব শ্রমিককে নিয়ে যাওয়ার সময় ঢালাইয়ের মিক্সার মেশিনের সাথে তাদের ডিআই ট্রাকে তুলে ফেলা হয়। ভারী ওজনের মিক্সার মেশিনের সাথে শ্রমিকদের তোলায় বিধিনিষেধ রয়েছে; কিন্তু সেটি কেউ তোয়াক্কা করে না। মেশিনের পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে ২০ থেকে ২৭ জনের বেশি তুলে ফেলা হয়। এতে হয়তো কিছু টাকা বাঁচে ঠিকাদারের; কিন্তু দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। কারণ ওই গাড়ির ভারসাম্য পুরোপুরি ঠিক থাকে না।

চালক প্রশিক্ষক আবদুর রহমান বলেন, ওভারলোড হলে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ রাখাটা কঠিন হয়ে পড়ে। ধরুন তিন টন ট্রাকে যদি আপনি ১০ টন তোলেন, তাহলে স্বাভাবিক অবস্থায় ব্রেক কষলে যতটা সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, এ ক্ষেত্রে ততটা নয়। এ ক্ষেত্রে চালক যতটা সতর্ক থাকা দরকার, ততটা থাকেন না; বরং বেপরোয়া গতিতে চালান। যে কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। এগুলো বন্ধ করতে হবে।

সিলেট মহানগর পুলিশের দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, দুর্ঘটনার পর ট্রাকের হেলপারকে আমরা আটক করেছি। সে বলেছে, গাড়িটা লোড ছিল। তিন মুখের ওখানে তার লোড গাড়ি নামছিল এ সময় বিপরীত দিকে আসা ডিআই ট্রাকও ওভার স্পিডে ছিল। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় লোড গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ডান দিকে মুখোমুখি ধাক্কা লাগে। অতিরিক্ত বোঝাইয়ের কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটে জানিয়ে ওসি বলেন, পণ্যবাহী বাহনে তো মানুষ চলাচল নিষিদ্ধ। শ্রমিকশ্রেণি কী, আমাদের দেশে সুযোগ পেলে অনেক সচেতন মানুষও উঠে পড়েন। একটা দুর্ঘটনা ঘটলে সবার টনক নড়ে। পরে আর খোঁজ থাকে না। ফলে এটাই চলছে।