আয় না বাড়লেও লাগামহীন বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম
Printed Edition
শামছুল ইসলাম
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দামে দিশাহারা সাধারণ মানুষ। কোনোভাবেই যেন মূল্যবৃদ্ধির পাগলা ঘোড়াকে থামানো যাচ্ছে না। আয় না বাড়লেও নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি নীরবে চাপ সহ্য করলেও নিম্ন আয়ের মানুষ পড়েছেন আরো করুণ পরিস্থিতিতে। জীবনযুদ্ধে তারা প্রতিদিনই সংগ্রাম করছেন, অনেকেই রয়েছেন হাঁসফাঁস অবস্থায়।
সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কয়েক বছরের ব্যবধানে চাল, ডাল, মশলা, মাছ, খেজুরসহ নিত্যপণ্যের শতভাগ পর্যন্ত বেড়ে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে। বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা একরকম কথা বলেন, আবার আড়তদাররা বলেন আরেক রকম। ক্রেতাদের কথা শোনার কেউ নেই। কেন বাড়ছে প্রতিনিয়ত নিত্যপণ্যের দাম তার সদুত্তর পাওয়াও যাচ্ছে না।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে ভোক্তারা একরকম অসহায় হয়ে পড়েছে। এর পেছনে রয়েছে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট, বাজার তদারকির অভাব, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য। ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে সীমিত করে দিয়েছে।
টিসিবির ২০২২ সালের ২৮ মে এবং ২০২৬ সালের ২৭ মার্চের বাজারদর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত চার বছরের ব্যবধানে প্রতিকেজি খেজুর দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। ২০২২ সালে প্রতিকেজি সাধারণ মানের খেজুর বিক্রি হয়েছে ১৫০ টাকায়। চলতি বছরে একই খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা কেজি দরে। চার বছর আগে প্রতিকেজি চিনি বিক্রি হয়েছে ৭৮ টাকা কেজি দরে। সে চিনি চলতি বছরে বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি দরে।
চার বছর আগে প্রতিকেজি সরু চাল বিক্রি বিক্রি হয়েছে ৫৮টাকা। সে চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০টাকা কেজি দরে। প্রতিকেজি মাঝারি চাল চার বছর আগে বিক্রি হয়েছে ৪৬টাকা। সেই চাল চলতি বছর বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা কেজি দরে। মাঝারি মানের প্রতিকেজি মশুরের ডাল চার বছর আগে ১২৫ টাকা বিক্রি হলেও বর্তমানে এটি বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। চার বছর আগে প্রতিকেজি শুকনা মরিচ ১৯০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে এটি বিক্রি হচ্ছে ২৭০ টাকা। প্রতিকেজি হলুদ চার বছর আগে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে এটি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা কেজি। আমদানিকৃত হলুদ চার বছর আগে ১৬০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা কেজি। চার বছর আগে প্রতিকেজি জিরা ৪০০ টাকা বিক্রি হলেও বর্তমানে এটি বিক্রি হচ্ছে ৬৪০ টাকা। চার বছর আগে প্রতিকেজি লবঙ্গ বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৫০ টাকা কেজি দরে। এটি চলতি বছরে বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ টাকা কেজি দরে। প্রতিকেজি ছোট এলাচ চার বছর আগে বিক্রি হয়েছে দুই হাজার টাকা কেজি দরে। এটি চলতি বছরে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে বিক্রি হচ্ছে চার হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে।
চার বছর আগে প্রতিকেজি ইলিশ মাছ বিক্রি হয়েছে ৬০০ টাকা কেজি দরে। এটি চলতি বছরে বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা কেজি দরে। চার বছর আগে প্রতিকেজি রুই ১৪০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা কেজি দরে। এ সব পণ্যের সাথে বেড়েছে গুড়া দুধের দামও। প্রতিকেজি ডিপ্লোমা দুধ ১৬০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ টাকা কেজি দরে। ৬২০ টাকার ফ্রেশ দুধ ১৯০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৮৩০ টাকা কেজিতে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় ৯ শতাংশের আশপাশে অবস্থান করছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক সময় ১০ শতাংশেরও বেশি হয়ে যাচ্ছে, যা দরিদ্র ও নিম্নœ আয়ের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে সরকারের কোনো নজর নেই, যার কারণে এ টালমাটাল অবস্থা চলছে। বাজারে এখন কোনো কিছুই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নেই। বিক্রেতারা নানা অজুহাতে দাম বাড়িয়েই যাচ্ছেন। আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য করা যায় না। সীমিত আয়ের মানুষকে প্রতি মাসে ঋণ করতে হচ্ছে। ইচ্ছা করলেও এখন আর পছন্দের মাছ কিনতে পারি না। ছোট মাছের দাম আরো চড়া। এক কেজি ছোট চিংড়ি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছ-মাংস কিনতে গেলে কয়েক হাজার টাকা নিয়ে যেতে হয়। সরকারের উচিত বাজার তদারকি করে মূল্য কেন বাড়ছে সেটা খুঁজে বের করা।
বাজার পর্যালোচনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাজারের সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থায় একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কম দামে পণ্য কিনে তা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছে। এ প্রক্রিয়ায় কৃষকের খরচ তুলতে কষ্ট হলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা ঠিকই তাদের অতি মুনাফার অংশটি লুটে নিচ্ছে। জানা যায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলে পণ্যের দাম যতটা কম, তার কয়েক গুণ বেশি খুচরায়। মাঝখানে খুব একটা দর বাড়া বা খরচ না হলেও নানা অজুহাতে খুচরায় কয়েক গুণ বেশি দাম নেয়া হয়। ভোক্তারা বলছে, এ চক্র ভাঙতে হবে সবার আগে। এটি কঠিন না হলেও তা করছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।