চুক্তি ছাড়াই শেষ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনা
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে চলা পরমাণুবিষয়ক আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। টানা ২১ ঘণ্টার নিবিড় আলোচনার পর কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়ে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধি দল নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া শর্তগুলো গ্রহণ না করায় এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অন্য দিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও তেহরানের প্রতিনিধিদলের প্রধান মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানি প্রতিনিধিদের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আলজাজিরা, বিবিসি ও রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গণমাধ্যমকে জানান, পাকিস্তান সরকারের আতিথেয়তায় দুই দেশের প্রতিনিধি দল দীর্ঘ সময় ধরে গঠনমূলক আলোচনা চালিয়েছে। আলোচনার এই ব্যর্থতার জন্য আয়োজক দেশ পাকিস্তানকে দায়ী করা যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান চমৎকার কাজ করেছে। তারা আমাদের এবং ইরানিদের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। আমরা প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে তাদের সাথে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেছি। এটি একটি ইতিবাচক দিক যে আমরা সরাসরি কথা বলেছি।’
তবে সমঝোতা না হওয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য বড় দুঃসংবাদ হিসেবে দেখছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য অনেক বেশি খারাপ খবর। আমরা আমাদের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমার বিষয়ে স্পষ্ট ছিলাম। কোন বিষয়ে আমরা ছাড় দেবো এবং কোন বিষয়ে দেবো না, তা তাদের পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইরানি পক্ষ আমাদের শর্তগুলো মেনে না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
আলোচনায় কোন বিষয়গুলো ইরান প্রত্যাখ্যান করেছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত না জানালেও ভ্যান্স প্রধান লক্ষ্যটি স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, ‘আসল কথা হলো, আমাদের এমন একটি ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন যে ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এমনকি পারমাণবিক অস্ত্র দ্রুত তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা প্রযুক্তিও তারা জোগাড় করবে না। এটিই মার্কিন প্রেসিডেন্টের মূল লক্ষ্য এবং আমরা আলোচনার মাধ্যমে এটিই অর্জনের চেষ্টা করেছি।’
ইরানের বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচির অবস্থা তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, ‘তাদের যে সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো আগে ছিল, সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইরান কি দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে কোনো মৌলিক প্রতিশ্রুতি দেবে? শুধু এখন বা দুই বছরের জন্য নয়, দীর্ঘস্থায়ী সদিচ্ছার প্রমাণ আমরা এখনো তাদের কাছ থেকে পাইনি। আমরা আশা করি ভবিষ্যতে সেটি পাব।’
জেডি ভ্যান্স জানান, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট আমাদের বলেছিলেন সদুদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনার টেবিলে যেতে এবং একটি চুক্তির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে। আমরা সেটিই করেছি, কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি। তারা আমাদের শর্ত গ্রহণে রাজি ছিল না।’
উল্লেখ্য, ২১ ঘণ্টার এই ম্যারাথন আলোচনার পুরো সময়জুড়েই মার্কিন প্রতিনিধি দলটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেছে। ভ্যান্সের ভাষ্যমতে, ‘গত ২১ ঘণ্টায় আমরা অন্তত ১২ বার প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলেছি। আমরা একটি চূড়ান্ত এবং সর্বোত্তম প্রস্তাব দিয়ে এসেছি। এখন দেখার বিষয় ইরানিরা শেষ পর্যন্ত সেটি গ্রহণ করে কি না।’
এদিকে পাকিস্তানে শান্তি আলোচনা শেষের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও তেহরানের প্রতিনিধিদলের প্রধান মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেছেন, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানি প্রতিনিধিদের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রকেই ঠিক করতে হবে তারা ইরানের আস্থা অর্জন করতে চায় কি-না- এক্সে দেয়া এক পোস্টে কালিবাফ এ কথা বলেন।
কালিবাফ বলেন, আলোচনার আগে তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, ‘ইরানের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা রয়েছে। কিন্তু আগের দুই যুদ্ধে অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিপক্ষের ওপর তাদের (যুক্তরাষ্ট্র) কোনো আস্থা নেই।’ ‘ইরানের প্রতিনিধি দল কিছু দুরদর্শী উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানি প্রতিনিধিদলের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে’। ‘আমরা এক মুহূর্তের জন্যও থামব না, এই ৪০ দিনের যুদ্ধে যা অর্জন করেছি, তা ধরে রাখতে আমরা কাজ চালিয়ে যাব,’ বলেন তিনি। তবে নিবিড় আলোচনা আয়োজন এবং তা সহজতর করার জন্য পাকিস্তানের চেষ্টার প্রশংসা করেছেন কালিবাফ।
ইরান যেসব দাবি মানেনি : সিএনএনকে মার্কিন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গতকাল সন্ধ্যায় শুরু হওয়া আলোচনা আজ সকালে গড়ায়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়। যা আর সমাধান করা যায়নি। তিনি বলেছেন, ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে হবে এবং সমৃদ্ধকরণকৃত ইউরেনিয়াম ছেড়ে দিতে হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে কোনো ছাড় দেয়া হবে না বলে ইরানকে জানানো হয়। কিন্তু ইরানি প্রতিনিধিরা এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। অপর দিকে ইরান দাবি করে তাদের ওপর যেসব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে সেগুলো তুলে দিতে হবে এবং বিদেশী ব্যাংকে ইরানের যেসব অর্থ জব্দ করে রাখা হয়েছে সেগুলো ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু ইরান যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে রাজি না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের শর্তে রাজি হয়নি। এরপর দুই পক্ষই জানায় আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা ইরানিদের গতকাল শর্ত দেন, আলোচনা চলার মধ্যেই হরমুজ খুলে দিতে হবে। কিন্তু ইরান স্পষ্ট করে জানায়, যতক্ষণ চুক্তি না হবে ততক্ষণ হরমুজ খুলে দেবে না তারা।
ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর তেহরানের উদ্দেশে রওনা দেয় ইরানি প্রতিনিধি দল। গতকাল রোববার ইরানের আধা-স্বায়ত্তশাসিত বার্তা সংস্থা মেহর জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাথে বেশ কয়েক দফা আলোচনার পর ইরানি প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদ ছেড়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি পাকিস্তানের স্থানীয় সময় সকাল ৯টার কিছুক্ষণ পরে ইসলামাবাদ ছাড়ে।
তাদের আগে শান্তি আলোচনায় অংশ নেয়া মার্কিন প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদ ছেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই প্রতিনিধি দলে অন্যদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও সাবেক উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারও ছিলেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি জানিয়েছেন, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলেও কূটনীতি ‘কখনো শেষ হয় না’। এই আলোচনার মধ্য দিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ‘বেশ কয়েকটি বিষয়ে বোঝাপড়ায় পৌঁছেছে’, দুই পক্ষের মধ্যে ‘শুধু দুই থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে’। ইরানি আলোচক দলের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের উদ্ধৃৃতি দিয়ে বার্তা সংস্থা ফারস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পরবর্তী পর্বের আলোচনার জন্য ‘ইরানের কোনো তাড়া নেই’। ফার্সের দেয়া উদ্ধৃতিতে ওই সূত্র বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একটি যুক্তিসম্মত চুক্তিতে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীর অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না।’ ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানি বাহিনীগুলো বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে রেখেছে।
হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলে অবরোধের হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের : ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ‘অবরোধ’ আরোপের প্রক্রিয়া শুরু করবে মার্কিন বাহিনী। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ভবিষ্যতে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হবে যেখানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। তবে তার অভিযোগ, ইরান বর্তমানে সেই পরিস্থিতি হতে দিচ্ছে না।
তিনি আরো জানান, মার্কিন নৌবাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এমন সব জাহাজ শনাক্ত ও থামানোর জন্য, যারা ইরানকে টোল বা শুল্ক দিচ্ছে। তার ভাষায়, ‘যারা বেআইনিভাবে টোল দেবে, গভীর সমুদ্রে তাদের নিরাপদ চলাচলের সুযোগ থাকবে না।’
টোল দিতে হবে ইরানি রিয়ালে : হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ ইরানের নিয়ন্ত্রণে দাবি করে সেখানে জাহাজ চলাচলে টোল আরোপের কথা জানিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবায়ি। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত মেহের নিউজ এজেন্সির বরাতে বিবিসি জানায়, হাজি বাবায়ি হরমুজ প্রণালীকে তেহরানের জন্য রেড লাইন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবি করেন, এই জলপথ পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে এবং এখানে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানি মুদ্রা ‘রিয়াল’-এ টোল পরিশোধ করতে হবে।
অন্য দিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালী শিগগিরই খুলে দেয়া হবে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তাদের নৌবাহিনীর দু’টি ডেস্ট্রয়ার ইতোমধ্যে প্রণালী অতিক্রম করেছে এবং সমুদ্রপথকে মাইনমুক্ত করার বৃহত্তর মিশনের অংশ হিসেবে কাজ করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির দাবি, মার্কিন জাহাজগুলো প্রণালী দিয়ে অতিক্রম করেনি। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে সামরিক জাহাজ চলাচলের যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবেলা করা হবে।