বেসরকারিভাবে নন-ইউরিয়া আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত কৃষি মন্ত্রণালয়ের

এ সিদ্ধান্তে সার সরবরাহে নতুন সঙ্কট তৈরি হতে পারে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বৈশ্বিক সার সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আমদানিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে নন-ইউরিয়া সার আমদানি বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকলে আসন্ন মৌসুমে সার সরবরাহে নতুন সঙ্কট তৈরি হতে পারে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধি শাখার আয়োজনে গত ৮ মার্চ অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যা ২৫ মার্চ অনুমোদন পায়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, মোট চারটি সিদ্ধান্তের একটি হিসেবে আগামী অর্থবছর থেকে বেসরকারি পর্যায়ে নন-ইউরিয়া সার আমদানি না করার প্রস্তাব নেয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সার বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় ও পরামর্শক কমিটির অনুমোদন নেয়া হবে।

সভায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও উপকরণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমাম বলেন, দেশে ইউরিয়া সার সরবরাহ করে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং নন-ইউরিয়া সার সংগ্রহ করা হয় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বিসিআইসি ও বেসরকারি খাতের মাধ্যমে। তিনি জানান, বিএডিসি সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে এবং বেসরকারি খাত টেন্ডারের মাধ্যমে সার আমদানি করে থাকে। তবে জিটুজি পদ্ধতির তুলনায় বেসরকারি আমদানির খরচ বেশি হওয়ায় এবং সংরক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে বেসরকারি খাতকে নিরুৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ লাখ মেট্রিক টন সারের চাহিদা রয়েছে, যার মধ্যে ২৬ লাখ টন ইউরিয়া এবং বাকিগুলো নন-ইউরিয়া। তবে বিএডিসির সংরক্ষণ সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অধীনে ৯৮টি সাধারণ এবং ৪৬টি পিএফজি সার সংরক্ষণাগার রয়েছে, যার স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা প্রায় ২ দশমিক ৮০ লাখ মেট্রিক টন এবং সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতা প্রায় ৬ দশমিক ৫০ লাখ মেট্রিক টন। এই সক্ষমতা দিয়ে প্রায় ৪০ লাখ মেট্রিক টন নন-ইউরিয়া সার আমদানির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ দিকে ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে, যা দেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারণ ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের একটি বড় অংশই এই অঞ্চল থেকে আমদানি করা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, সরকারের কাছে জুন পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর মতো সারের মজুদ রয়েছে। ফলে চলতি বোরো মৌসুম সামাল দেয়া সম্ভব হলেও আসন্ন আমন মৌসুম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিকল্প উৎস থেকে সার সংগ্রহ করাও সহজ নয়, ফলে পুরো বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

সভায় বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো: ফজলুর রহমান বলেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউরিয়া সারের উৎপাদন, আমদানি ও মজুদ পরিস্থিতি সন্তোষজনক রয়েছে এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অধিকাংশ চালান ইতোমধ্যে দেশে পৌঁছেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, জুনের পর পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। গ্যাস স্বল্পতার কারণে বর্তমানে দেশের পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে চারটি বন্ধ রয়েছে, যার মধ্যে একটি আংশিক চালু হয়েছে। কাফকো ও ঘোড়াশাল সার কারখানা সচল রাখা না গেলে আগামী অর্থবছরে ইউরিয়া নিয়েও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বিএডিসির একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে তাদের মোট সারের মজুদ প্রায় ১১ দশমিক ৪ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ৫ দশমিক ৭১ লাখ টন গুদামে সংরক্ষিত এবং ৫ দশমিক ৩৩ লাখ টন পরিবহনাধীন রয়েছে। এ ছাড়া নতুন ১৪টি সার সংরক্ষণাগার নির্মাণাধীন থাকলেও জুনের মধ্যে মাত্র ৪টি চালু হলে অতিরিক্ত প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন সংরক্ষণ সুবিধা যুক্ত হবে, যা সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় খুবই সীমিত।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, সরকার চাইলে বিএডিসির মাধ্যমেই সব সার আমদানি করতে পারে, তবে এ জন্য সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ প্রস্তুতি ছাড়া বেসরকারি খাতকে বাদ দিয়ে এককভাবে সরকারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ালে তা উল্টো সঙ্কট তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে নেয়া এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সতর্কতা অবলম্বন না করলে কৃষি খাতেই এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে।