গ্যারেজ থেকে বিশ্বজয়
Printed Edition
আহমেদ ইফতেখার
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার এক ছোট গ্যারেজে শুরু হয়েছিল পথচলা। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে প্রযুক্তি জগতের অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান অ্যাপল। বর্তমানে ৫০ বছরে পদার্পণ করেছে টেক জায়ান্টটি। শুধু একটি প্রযুক্তি কোম্পানি হিসেবে নয়; বরং আধুনিক জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে অ্যাপল।
১৯৭৬ সালে স্টিভ ওজনিয়াক একটি কম্পিউটার সার্কিট বোর্ড ডিজাইন করেন। তার ইচ্ছা ছিল স্থানীয় ক্লাবের শৌখিন বন্ধুদের সাথে এটি শেয়ার করা। কিন্তু তার বন্ধু স্টিভ জবস এর মধ্যে দেখেছিলেন এক বিশাল ব্যবসায়িক সম্ভাবনা। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় অ্যাপল। এরপর গত পাঁচ দশকে ডেস্কটপ কম্পিউটার থেকে শুরু করে স্মার্টফোন, সব কিছুকেই সাধারণ মানুষের নাগালে এনেছেন ওজনিয়াক ও জবস। বিশেষ করে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের অনন্য সমন্বয় ও মোবাইল অ্যাপের জনপ্রিয়তা প্রযুক্তি বিশ্বে একচ্ছত্র আধিপত্য এনে দিয়েছে অ্যাপলকে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আয় প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলারের কাছাকাছি।
১৯৭৭ সালে অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস যখন ডিজাইনার রব জানফকে লোগো তৈরির দায়িত্ব দেন, তখন একটাই কড়া নির্দেশ ছিল লোগোটি যেন মোটেও ‘কিউট’ না লাগে। এক সাক্ষাৎকারে জানফ বলেন, তিনি কম্পিউটারকে মানুষের কাছে সহজবোধ্য ও আনন্দদায়ক করে তুলতে চেয়েছিলেন। জানফ তার পুরো ক্যারিয়ারে এটিই একমাত্র কাজ, যেখানে তিনি ক্লায়েন্টকে মাত্র একটি আইডিয়া দেখিয়েছিলেন এবং সেটিই ইতিহাস হয়ে গেছে।
প্রতিযোগীদের চেয়ে আলাদা হতে অ্যাপল সবসময় রঙের ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। ১৯৯৮ সালে আসা প্রথম প্রজন্মের আইম্যাকে ক্যান্ডির মতো নীল ও সবুজ রঙের স্বচ্ছ খোলস ব্যবহার করা হয়েছিল। সেটা একই সাথে দৃষ্টিনন্দন এবং ভেতরের হাইটেক যন্ত্রাংশ দেখার সুযোগ দিয়েছিল।
মেটালিক গ্রে রঙের আইপড খুব দ্রুতই উজ্জ্বল সব রঙে ছেয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে আইফোন সিক্স-এসেররোজ গোল্ড সংস্করণটি এতই জনপ্রিয় হয় যে, পরে ‘মিলিনিয়াল পিঙ্ক’ ট্রেন্ড নামে পরিচিতি পায়।
স্টিভ জবস আর স্টিভ ওজনিয়াককে সবাই অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে চিনলেও, অ্যাপলের তৃতীয় ব্যক্তি রোনাল্ড ওয়েন। ১৯৭৬ সালে চুক্তিতে সই করেছিলেন রোনাল্ড। ভিডিও গেম কোম্পানি ‘আটারি’র ইঞ্জিনিয়ার ওয়েন অ্যাপলের ব্যবসাটি সফল হবে কিনা, তা নিয়ে ভয় পাচ্ছিলেন। মাত্র ১১ দিনের মাথায় তিনি তার ১০ শতাংশ শেয়ার মাত্র দুই হাজার ৩০০ ডলারে বিক্রি করে দেন। ওয়েন যদি সেই শেয়ার ধরে রাখতেন, ২০২৬ সালে এসে তার মূল্য দাঁড়াত প্রায় ৩৭০ বিলিয়ন ডলার। এটাকে ইতিহাসে অন্যতম বড় মিসড অপরচুনিটি হিসেবে ধরা হয়।
সাফল্যের চূড়ায় থাকলেও বর্তমানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে অ্যাপল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যুগে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এগিয়ে যাচ্ছে গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীরা। বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৭ সাল থেকে চিপসেটে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করলেও সিরির মতো ফিচারে আধুনিকতার ছোঁয়া আনতে দেরি করেছে অ্যাপল। এছাড়া ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্মার্টফোনের বিকল্প এআই ডিভাইস আনার পরিকল্পনা করছে, যা অ্যাপলের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।
প্রতিযোগিতা থাকলেও অ্যাপল পণ্যের জনপ্রিয়তা এখনো তুঙ্গে। সাম্প্রতিক আইফোন ১৭ সিরিজ ও সাশ্রয়ী দামের ‘ম্যাকবুক নিও’ বাজারে আসার পর গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে কোম্পানিটি। তবে বিশ্লেষক বেন থম্পসনের মতে, আগামী ৫০ বছর অ্যাপল কতটা সফল হবে তা নির্ভর করবে এআই প্রযুক্তিতে তারা ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের কতটা টেক্কা দিতে পারে তার ওপর।