হঠাৎ সয়াবিন তেলের সঙ্কট, বাড়ছে খোলা তেলের দাম

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

হঠাৎ সয়াবিন তেলের সরবরাহে সঙ্কট দেখা দিয়েছে রাজধানীর বাজারে। খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও সরবরাহ কমে যাওয়া এবং ডিলার পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির কারণে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একই সাথে বেড়েছে খোলা সয়াবিন ও পামতেলের দাম, যা ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১ ও ২ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রায় উধাও হয়ে গেছে। অনেক দোকানে পাঁচ লিটারের বোতল সীমিত পরিমাণে পাওয়া গেলেও ছোট বোতলের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এতে সাধারণ ক্রেতারা প্রয়োজনের তুলনায় বড় বোতল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

রূপনগর এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, কয়েকটি দোকান ঘুরেও তিনি ছোট বোতলের তেল পাননি। পরে বাধ্য হয়ে পাঁচ লিটারের একটি বোতল কিনতে হয়েছে। তার মতো অনেক ক্রেতাই এমন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে জানা গেছে।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, শেওড়াপাড়া বাজার ও কাওরানবাজারে ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা চাহিদা মতো তেল পাচ্ছেন না। ডিলারদের কাছ থেকেও আগের তুলনায় কম তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে দোকানগুলোতে তেলের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে তারা জানান।

অধিকাংশ ব্যবসায়ী জানান, আগে যেখানে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ কার্টন তেল পাওয়া যেত, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ থেকে ৩ কার্টনে। এ অবস্থায় দোকানগুলোতে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক বিক্রেতা অভিযোগ করেন, ডিলাররা চাহিদা অনুযায়ী তেল দিচ্ছেন না।

কাওরানবাজারে ডিলারদের দোকানে খুচরা ব্যবসায়ীদের ভিড় লক্ষ করা গেছে। অনেকেই চাহিদার তুলনায় কম তেল পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এ কেমন পরিস্থিতিতে বাজারে সরবরাহ সঙ্কট আরো প্রকট হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ভোক্তাদের আচরণও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ব্যবসায়ীদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সঙ্ঘাতের প্রভাবে সম্ভাব্য সঙ্কটের আশঙ্কায় অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন। সামনে ঈদুল ফিতর থাকায় বাজারে চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। এই দুই কারণে বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

এদিকে বোতলজাত তেলের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) অপরিবর্তিত থাকলেও ডিলার পর্যায়ে দাম বেড়েছে। আগে পাঁচ লিটারের বোতল যেখানে ৯৩০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে হচ্ছে প্রায় ৯৫০ টাকায়। ফলে খুচরা বিক্রেতাদের লাভ কমে গেছে। তারা এমআরপি অনুযায়ী ৯৫৫ টাকাতেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এদিকে কিছু ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তেল বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে ১ লিটারের বোতল, যার এমআরপি ১৯০ টাকা, তা কোথাও কোথাও ২২০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বোতলজাত তেলের সঙ্কটের প্রভাব পড়েছে খোলা তেলের বাজারেও। গত কয়েক দিনে খোলা সয়াবিন ও পামতেলের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৫ টাকা বেড়েছে। পাইকারি বাজারে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৯৮ থেকে ২০০ টাকায়, যা কয়েক দিন আগে ছিল ১৯৩ থেকে ১৯৫ টাকা। একইভাবে খোলা পামতেলের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭০ টাকা, যা আগে ছিল ১৬৫ টাকা।

খোলা তেলের প্রতি চাহিদা বেড়ে যাওয়াকেই এর মূল কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। বোতলজাত তেল না পেয়ে অনেক ক্রেতা খোলা তেলের দিকে ঝুঁকছেন, ফলে এ বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে।

ডিলাররা সরবরাহ কমে যাওয়ার জন্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলেও কোম্পানিগুলো এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং কোনো ধরনের ঘাটতি নেই।

একটি ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা জানান, মিল গেট থেকে সরবরাহ কমানো হয়নি এবং মজুদও পর্যাপ্ত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিরও কোনো প্রভাব এখনো বাজারে পড়েনি বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে ডিলার পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোম্পানি থেকে যে পরিমাণ তেল পাওয়া যাচ্ছে, তারা সেটিই বাজারে ছাড়ছেন। অতিরিক্ত মজুদ রাখার সুযোগ নেই। সরবরাহ বাড়লেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা মনে করছেন।

এমন পরিস্থিতিতে বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর জানিয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরবরাহে কোনো কৃত্রিম সঙ্কট বা অনিয়ম আছে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহে ঘাটতি, আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত কেনাকাটা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, এই তিনটি কারণে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করে চাহিদা আরো বাড়তে পারে, যা সঙ্কটকে আরো তীব্র করে তুলতে পারে। বাজারে নজরদারি জোরদার করা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।