আশ্রয়হীন অশীতিপর আনোয়ারা জীবনযুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বাস্তবতা
Printed Edition
এনামুল হক রাজাপুর (ঝালকাঠি)
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেখানে স্বস্তি আর নিরাপত্তা পাওয়ার কথা, সেখানে ৮০ বছর বয়সেও টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার আংগারিয়া গ্রামের আনোয়ারা বেগম। তার জীবনগাথা শুধু ব্যক্তিগত বঞ্চনার গল্প নয়; বরং সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার ফাঁকফোকরেরও এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
প্রায় চার দশক আগে স্বামী হারানোর পর থেকেই সংগ্রামই হয়ে ওঠে তার জীবনের সঙ্গী। দিনমজুর স্বামীর রেখে যাওয়া সামান্য বসতভিটা আর নিজের শ্রমে পাঁচ সন্তানকে বড় করলেও দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হতে পারেননি কেউই। সন্তানরা আজও দিন আনে দিন খায়, রিকশা চালানো কিংবা দিনমজুরির আয়ে নিজেদের সংসার চালাতেই হিমশিম খায়। ফলে বার্ধক্যে মায়ের দায়িত্ব নেয়া তাদের জন্য হয়ে উঠেছে কঠিন বাস্তবতা।
আনোয়ারার জীবনে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে আট মাস আগে, এক কালবৈশাখী ঝড়ে যখন তার একমাত্র ঝুপড়ি ঘরটি ধ্বংস হয়ে যায়। সেই থেকে তিনি কার্যত গৃহহীন। কখনো মেয়ে-জামাইয়ের বাড়ির এক কোণে, কখনো অন্যের বারান্দায় রাত কাটান। অনিশ্চিত এই আশ্রয় তাকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়, বেঁচে থাকাটাই যেন এখন তার জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এ বাস্তবতা আরো প্রশ্ন তোলে, রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কতটা প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। দেশে গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পে হাজার হাজার ঘর নির্মাণের সরকারি উদ্যোগ থাকলেও আনোয়ারার মতো প্রকৃত অভাবী মানুষেরা কেন সেই সুবিধার বাইরে থেকে যাচ্ছেন, এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাদের মতে, সঠিক বাছাই ও তদারকির ঘাটতিই এ ধরনের বঞ্চনার অন্যতম কারণ।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের নজরে আসায় কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে। রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরী আনোয়ারার ভিটা পরিদর্শন করে সেখানে একটি ঘর নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি তাকে জরুরি খাদ্য সহায়তাও দেয়া হয়েছে। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, একটি ঘর নির্মাণই কি আনোয়ারার জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে? নাকি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা, যাতে এমন মানুষদের শেষ বয়সে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে না হয়? আংগারিয়ার এই বৃদ্ধা এখনো অপেক্ষায়, একটি স্থায়ী আশ্রয়ের, যেখানে অন্তত জীবনের শেষ সময়টুকু শান্তিতে কাটাতে পারবেন।