৩ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখে নির্যাতন করা হয় সাংবাদিক আলি জামশেদকে

অপকর্মের সিরিজ নিউজের জন্য ক্ষিপ্ত ছিলেন এসি ল্যান্ড

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

কিশোরগঞ্জের নিকলির এসি ল্যান্ড প্রতীক দত্তের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। এসব অভিযোগ নিয়ে তার বিরুদ্ধে এর আগেও অনেক গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করেছে। সর্বশেষ গত ১২ মার্চ এসি ল্যান্ড অফিসে রিকশাওয়ালাকে থাপ্পড় মারার বিষয়ে আলি জামশেদ সংবাদ পরিবেশন করাতেই তার ওপর নেমে আসে এসি ল্যান্ড প্রতীক দত্তের খড়গ। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নামে নয়া দিগন্তের নিকলি প্রতিনিধি আলি জামশেদকে তিন ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে তার ওপর মানসিক নির্যাতন চালায় এ এসি ল্যান্ড। এরপর মোবাইল কোর্টের নামে তাকে শাস্তি দিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়।

আলি জামশেদ জানান, পরিকল্পিত ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অন্যান্য সাংবাদিকদের সাথে থেকে সংবাদ পরিবেশনের কাজ শেষ করে নিকলী বেড়িবাঁধ মোড়ের একটি হোটেল মালিকের সাথে কথা বলছিলেন তিনি। এমন মুহূর্তে এসি ল্যান্ড অফিসের গাড়ি এসে হাজির। গাড়ি থেকে নেমে প্রথমেই ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে জামশেদকে বের হতে নির্দেশ দেন এসি ল্যান্ড প্রতীক দত্ত। তাকে ভাই বলে সম্বোধন করতেই অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করেন। ভয়ে হোটেল মালিকও বাহিরে চলে যান। এসি ল্যান্ডের সাথে থাকা একাধিক লোক তখন বাহিরে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছে । এমন সময়ে ব্যক্তিগত কাজের ১০ লাখ টাকার ব্যাগটি নিয়ে যান এসি ল্যান্ডের গাড়ির দিকে। এসি ল্যান্ড সাংবাদিককে চুপ থাকতে হুমকি দেন। তিনি ম্যাজিস্ট্রেট বলে দাবি করেন। সে সময়ে তিনি বলতে লাগলেন ‘অনেক লেখালেখি করেছিস আমার বিরুদ্ধে’ গরুর হাটে আদালত পরিচালনার দিনও তোকে পাইনি। আমাকে টাকা না দিয়ে এলাকার পাবলিককে বলার মজা আজ তুই টের পাবি। এ ছাড়াও নিউজের মজা আজ টের পাবে বলেও উল্লেখ করেন। তা ছাড়াও বলতে থাকেন তোর কোন বাবা আছে এখন তোকে বাঁচানোর। আমি ইচ্ছে করলেই তোকে আজ অস্ত্র মামলা থেকে শুরু করে মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দিতে পারি। এখন দেখ তোকে আজ কী অবস্থা করি। জামশেদ কথা বলতে চাইলে এসি ল্যান্ড চোখের সামনে আঙুুল উঠিয়ে বলতে থাকেন, আজ তোর বলার সময় নাই, তুই শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবি। তোর মতো বহু লোককে আমি সাইজ করেছি এখন বাকি তোর পালা। আমার বিরুদ্ধে লিখে আগেও কেউ কিছু ছিঁড়তে পারেনি। পত্রিকায় বহু ছাপা হয়েছে এসবে কিছুই ছিঁড়তে পারবে না, আজ তোর পালা। এমন দম্ভোক্তির হুমকিও এসি ল্যান্ড প্রদান করেন।

হতভম্ব হয়ে আমি (সাংবাদিক) এক পর্যায়ে জবাব দিলেই এসি ল্যান্ড ক্ষিপ্ত হয়ে বাহিরের লোককে সামনে আসতে ডাকেন। তখন তার সাথের লোককেও ভিডিও করতে বলেন হোটেল থেকে বাহিরে এসে।

সাথে সাথেই ভাষা পাল্টে ভিডিওর সামনে গিয়ে আলি জামশেদকে আপনি বলে সম্বোধন শুরু করে দেন এসি ল্যান্ড। তাকে হোটেলের পাশে রাখা একটি মোটর সাইকেলের কাছেও নিয়ে যান। এক পর্যায়ে পুলিশও ডাকেন। পুলিশ আসার পর তখন সাজানো ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন হোটেল থেকে টেবিল বের করে। অপরাধ স্বীকারের লক্ষ্যে চাপ প্রয়োগ করেন। আমি অপরাধী নই এমন কথা বলতেই তিনি কৌশলিক কায়দায় ম্যাজিস্ট্রেট ম্যাজিস্ট্রেট বলে চাপ স্বীকার করতে বলেন। সে সময়ে মামলার ভয়ভীতিও প্রদর্শন করেন। এসি ল্যান্ড তার নিজের মাথায় ছাতা দিয়ে আমাকে শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্যে রোদে দাঁড় করিয়ে রাখেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমি রোজাদার আর অসুস্থতার কথা বললে শত শত জনতার সামনে বেলা শেষে একটুখানি বসতে দেন। তখন উৎসুক জনতা ভিড় জমান।

ভিড়ের মধ্যে টাকার কথা একাধিকবার উল্লেখ করা হয়। অপরাধ স্বীকারের পাশাপাশি স্বাক্ষর না করায় অবশেষে পুলিশের গাড়িতে করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। মাগরিবের আজানের দিকে হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় পুলিশি ব্যারাকে ইফতার করানো হয় জামশেদকে। দুই হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে হাজির করা হয়। বিজ্ঞ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিচক্ষণতার সহিত আমার ঘটনার বাস্তবতা জানতে চান। জবাবে সব সত্য তুলে ধরার পাশাপাশি এসি ল্যান্ড প্রতীক দত্তের বিরুদ্ধে সিরিজ নিউজের প্রমাণও দেখাতে বলেন। সাথে থাকা একজন পুলিশের মোবাইলে জামশেদের ভেরিফাইড ফেসবুক সার্চ দিয়ে দেখানো হয়। জামিনে মুক্তির লক্ষ্যে উকিল ডাকতেও নির্দেশ প্রদান করেন তিনি।

ওকালতনামায় সই করে জামিন নিয়ে নিচে নেমে এলেও জামশেদের সাংবাদিকতার কাজের গুরুত্বপূর্ণ ডিভাইস, মুঠোফোন, চেকসহ নগদ টাকা, চাবিসহ জিনিসপত্র পাওয়া যায়নি। আইনি প্রক্রিয়ায় তা ফেরত নিতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয় সে সময়ে।

ওই সময়ে সাংবাদিকের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, প্রেস কার্ড, তিনটি মোবাইল ফোন, একটি ভয়েস রেকর্ডার, একটি পাওয়ার ব্যাংক, পাঁচ লাখ টাকার একটি চেক ও নিজের বিল্ডিংয়ের বেশ কিছু চাবি ও একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। সাজানো ভ্রাম্যমাণ আদালতকালে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, সাংবাদিকের সাথে থাকা ১০ লাখ টাকার একটি ব্যাগ জব্দ তালিকায় না নিলেও পরে তা নিয়ে যায়। টাকার বিষয়টি চিৎকার করে ওই সাংবাদিক সবাইকে শোনালেও প্রশাসন ছিল ‘নীরব’।

নিকলীতে এভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে চলেছেন এসি ল্যান্ড প্রতীক দত্ত। বুয়েটের শিক্ষক ও ছাত্র পেটানোর পারদর্শী আলোচিত ছাত্রলীগের সাবেক বুয়েট শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এই ক্যাডার প্রতীক দত্ত। তিনি ৩৮তম বিসিএস ক্যাডার। চাকরির সুবাদে অনেক কিছু করেছেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে।

২০১৪ সালের দিকে বুয়েটে ছাত্রাবস্থায় বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও দুর্ধর্ষ ক্যাডার হিসেবে অতি পরিচিতি পায়। বুয়েটের অনেক ছাত্র তার হাতে নির্যাতনের শিকার হয়। রেহাই পায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও। তৎকালীন প্রতীকের বিরুদ্ধে মামলাও করেন বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী তানজিল রহমানের বাবা আলমগীর সিকদার। রাজধানীর শাহবাগ থানায় ছাত্র নির্যাতনের ঘটনায় ফৌজদারি আইনেই সেই মামলা হয়। মামলাসূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বুয়েটের বস্তু ও ধাতব কৌশল বিভাগের ফাউন্ড্রি ল্যাবে একাডেমিক অ্যাসাইনমেন্টের কাজে যায় বুয়েটে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী তানজিল রহমান। সেখানেই তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়।

৩৮তম বিসিএসে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবনে পা রাখেন এ ছাত্রলীগ ক্যাডার। তবে গুঞ্জন রয়েছে তার ডোপ টেস্ট আড়ালের বিষয়ে। চাকরিতে যোগদান পরবর্তীতে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে বয়োজ্যেষ্ঠ এক ব্যবসায়ীর মুখে ‘হোল্ড অন’ শুনে ক্ষেপে গিয়ে অপমান করেন। সেখানেও তিনি অনেকখানি অনিয়ন্ত্রিতের কারণে সমালোচনার জন্ম দেন।

২০২৪ সালের ২৩ মে কোটালিপাড়া উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগ দেয়ার পরে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অসংখ্য গণমাধ্যমে জানান। সেখানেও ইচ্ছাকৃতভাবে জমির নামজারি, মিসকেস ও মিউটেশনের ক্ষেত্রে নিজের পছন্দের লোকদের পক্ষে রায় দেন। বিভিন্ন ব্যক্তিকে অবৈধভাবে চাপ দিয়ে নিজের অফিস রুমে এসি, গাড়ির শেড, লোহার গেটসহ বিভিন্ন সুবিধা উপঢৌকন গ্রহণ করেন বলে ওঠে আসে।

১৭ ডিসেম্বর দুপুরে কোটালিপাড়ার কুশলা ইউনিয়নের জামিলা গ্রামে একটি নির্মাণাধীন ব্রিজের অ্যাপ্রোচ সড়কে মাটি দেয়াকে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে প্রতীক দত্ত প্রকাশ্যে বাবার বয়সী ঠিকাদার আব্দুস সামাদের গালেও সজোরে চড় মারেন। ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হলে পুরো কোটালিপাড়ায় এ নিয়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। এ সময় উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল আজম, উপসহকারী প্রকৌশলী মনজুরুল হক, নির্মাণ শ্রমিকসহ অর্ধশতাধিক লোকজন উপস্থিত ছিলেন বলেও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

নিকলীতে যোগদান; পরবর্তীতে তার সীমাহীন অপকর্মের বিরুদ্ধে নয়া দিগন্তে বস্তুনিষ্ঠভাবে সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তবুও বহাল তবিয়তেই থাকে বলে স্থানীয় ভুক্তভোগীদের সীমাহীন অভিযোগ।