পুঁজিবাজারকে টেকসই হতে দিচ্ছে না দ্রুত ধনী হওয়ার মানসিকতা

Printed Edition
artho-1
পুঁজিবাজারকে টেকসই হতে দিচ্ছে না দ্রুত ধনী হওয়ার মানসিকতা

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদে মুনাফা অর্জনের পরিবর্তে ক্যাপিটাল গেইনের মাধ্যমে দ্রুত বড় লোক হওয়ার মানসিকতাই দেশের পুঁজিবাজারকে টেকসই হতে দিচ্ছে না- এমনটাই মনে করছেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিশ্বের উন্নত পুঁজিবাজারের সাথে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের এটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

পুঁজিবাজারের মূল উদ্দেশ্য হলো উৎপাদন ও সেবা খাতে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সরবরাহ করা। সারা বিশ্বে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেবামূলক খাতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারই সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। উদ্যোক্তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন এবং এর সুফল ভোগ করেন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী-উভয়ই।

বাংলাদেশেও একই দর্শন থেকে পুঁজিবাজারের যাত্রা শুরু হলেও সময়ের পরিক্রমায় এটি পরিণত হয়েছে শেয়ারের কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে দ্রুত ক্যাপিটাল গেইন করার এক অনৈতিক খেলায়। হাতেগোনা কিছু মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি ছাড়া দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির ক্ষেত্রেই এই বাস্তবতা দেখা যায়। এর পরিণতিতেই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পুঁজিবাজারকে দুইবার বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে।

প্রথম বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয় ১৯৯৫ সালের শেষ দিকে। সে সময় দেশের একটি বৃহৎ শিল্পগ্রুপ পরিকল্পিতভাবে শেয়ারের দাম বাড়ানোর খেলায় জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে আরো কয়েকটি গ্রুপ এতে যুক্ত হয়। একই বছরে চট্টগ্রামে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজারের যাত্রা শুরু হয়। রাজধানীর বাইরে নতুন পুঁজিবাজার প্রতিষ্ঠার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উভয় পুঁজিবাজারের কয়েকজন সদস্য ও কিছু উদ্যোক্তা গ্রুপ মিলে অর্থ লুটের খেলায় মেতে ওঠে। এর ফলে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ভয়াবহ পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। পরবর্তী তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের চিত্র উঠে আসে।

বিপর্যয়ের পর দীর্ঘদিন পুঁজিবাজার কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। কোনো রকমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করতে হয় ঢাকা ও চট্টগ্রাম- উভয় স্টক এক্সচেঞ্জকে। তবে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হলে আবারো একই প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এবার উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের তদবিরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাঠামো ঢেলে সাজানো হয়, যাতে এই অনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন আরো সহজ হয়।

এর ফল পেতে সময় লাগেনি বেশি। ২০১০ সালে পুঁজিবাজার আবারও বিপর্যয়ের মুখে পড়ে- যা আগের চেয়েও ভয়াবহ ছিল। এ বিপর্যয়ে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হন, এমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে। এবারের বিপর্যয়ের পেছনেও আগের মতোই একটি বৃহৎ শিল্পগ্রুপের পাশাপাশি সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এবারও তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও কার্যকর কোনো শাস্তির নজির দেখা যায়নি।

তবে দুই বিপর্যয়ের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য ছিল। দ্বিতীয়বার সরকারঘনিষ্ঠ মহল পুঁজিবাজারকে ব্যবহার করে ভিন্ন কৌশলে। একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেসরকারি কোম্পানির ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ না থাকলেও চাপের মুখে সেই বিধান শিথিল করা হয়। ফলে একই গ্রুপের একাধিক বেসরকারি কোম্পানি ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে বাজারে আসে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও সেবা খাতের দুটি কোম্পানি অভিহিত মূল্য ১০ টাকার শেয়ার ২০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকায় বিক্রি করে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নেয়।

এর পর দুই বছরেরও কম সময়ে সেবা খাতের কোম্পানিটিকে একই গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠানের সাথে একীভূত করে কার্যত বিলুপ্ত করা হয়। অপর বিদ্যুৎ কোম্পানিটির শেয়ার ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগেই নেমে আসে ২০ টাকার নিচে। ডিরেক্ট লিস্টিং ও প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে এভাবে বাজার থেকে বিপুল অর্থ তুলে নিয়ে পুঁজিবাজারকে ফাঁপা করে দেয়া হয়।

দুটি বড় বিপর্যয় থেকে বিনিয়োগকারীদের শেখার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। দ্রুত বড় লোক হওয়ার মানসিকতা বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশের মধ্যে আরো দৃঢ় হয়েছে। এর প্রভাব বর্তমান বাজার আচরণে স্পষ্ট। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে খাতভিত্তিক কোম্পানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। ২০২২-২৩ সালে বীমা খাতের বহু কোম্পানির শেয়ার কয়েক মাসেই ২০০ থেকে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়, যার পেছনে মৌলিক কোনো কারণ ছিল না। একই প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে স্বল্প মূলধনী ও দুর্বল মৌলভিত্তির কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাজার কর্তৃপক্ষের পক্ষেও এসব ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ‘আমার টাকা দিয়ে আমি শেয়ার কিনব- কার কী বলার আছে’ ধরনের মানসিকতা কাজ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, আইন দিয়ে এই মানসিকতা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পুঁজিবাজারকে টাকা কামানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অধিকাংশ ঘটনাই আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে করা হয়েছে। ডিরেক্ট লিস্টিং, প্রেফারেন্স শেয়ার, একীভূতকরণ আইন এমনকি বহুল গ্রহণযোগ্য বুক বিল্ডিং পদ্ধতিও অপব্যবহার করা হয়েছে। বাস্তবতা হলো, প্রিমিয়ামে বা বুক বিল্ডিংয়ের মাধ্যমে বাজারে আসা কোনো কোম্পানির শেয়ার যত দিন ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংকারদের হাতে থাকে, তত দিন দর ধরে রাখা হয়। শেয়ার বিক্রি শেষ হলেই দর পতন শুরু হয়- ইউনিক হোটেল, বারাকা পাওয়ার ও সাম্প্রতিক বেস্ট হোল্ডিং তার উদাহরণ।

বিশ্লেষকদের মতে, পুঁজিবাজারকে টেকসই ও শক্তিশালী করতে তথাকথিত ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসির চেয়েও বেশি প্রয়োজন পুঁজিবাজারের প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা। ক্যাপিটাল গেইনের মোহে না পড়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মানসিকতা নিয়ে কোনো কোম্পানির মুনাফার অংশীদার হওয়াই হতে পারে একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের ভিত্তি।