সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামানের বিদেশে হাজারের বেশি ফ্ল্যাট-বাড়ি
Printed Edition
জিলানী মিল্টন
- আনুমানিক মূল্য ১১ হাজার কোটি টাকা
- উদ্ধারে আইনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দুদক
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের নামে বিদেশে হাজারেরও বেশি ফ্ল্যাট-বাড়ির সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদক জানায়, সাইফুজ্জামান ও তার পরিবারের নামে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়াসহ বিশ্বের ৯টি দেশে এক হাজার ১২২টি ফ্ল্যাট, প্লট ও বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। যা বাংলাদেশী টাকায় এসব সম্পদের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, এসব সম্পদের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে ১২টি মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র দু’টি দেশ থেকে জবাব মিলেছে। দুদক এই সম্পদ উদ্ধারে আইনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও দুবাইতে বাংলাদেশের আদালতের ছয়টি ক্রোক আদেশ পাঠানো হয়েছে।
খোঁজ পাওয়া সম্পদের বিবরণ অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি সম্পদ যুক্তরাজ্যে। সেখানে ৮০৬টি স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। এ ছাড়া কম্বোডিয়ায় ১১৬টি, দুবাইতে ৭৩টি, মালয়েশিয়ায় ৪৭টি, যুক্তরাষ্ট্রে ৪১টি, থাইল্যান্ডে ২৪টি, ভারতে ১১টি, ভিয়েতনামে চারটি এবং ফিলিপাইনে দু’টি সম্পদ মিলেছে। এসব সম্পদের অধিকাংশই ফ্ল্যাট, তবে কিছু প্লট ও বাড়িও রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট দুদকের কর্মকর্তা বলেন, সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামানের দুর্নীতির বিষয়ে দুদক ইতোমধ্যে ৩০টি মামলা দায়ের করেছে। আরো ডজনখানেক মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তবে, বর্তমানে কমিশনে চেয়ারম্যান, কমিশনার না থাকায় অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দুদক কর্মকর্তা বলেন, সাইফুজ্জামান বাংলাদেশের সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী ছিলেন। অথচ তিনি ২০১২ সাল থেকেই ভারতের নাগরিক। দুদক টিম ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অব ইন্ডিয়া কর্তৃক তার নামে ইস্যু করা আধার কার্ডের প্রমাণ করেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুদক অভিযান চালিয়ে তার দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট ২৩ বস্তা কাগজপত্র জব্দ করে। সেখানে ভারতে কেনা সম্পদ ও আধার কার্ড সংশ্লিষ্ট বিস্তারিত তথ্য মিলেছে।
৯ দেশে সম্পদের পাহাড় :
দুদকের তথ্যমতে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী সবচেয়ে বেশি সম্পদ গড়েছেন যুক্তরাজ্যে। সেখানে ৮০৪টি ফ্ল্যাট বা বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেছে, যার মূল্য ৮৫১০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কম্বোডিয়া, যেখানে ১১১টি ফ্ল্যাট ও প্লটের তথ্য মিলেছে, যার দাম প্রায় ৩৮০ কোটি টাকা।
এ ছাড়া দুবাইতে ৭৩টি ফ্ল্যাট-বাড়ির দাম ৭৬১ কোটি টাকা, যুক্তরাষ্ট্রে ৪১টি ফ্ল্যাট-বাড়ির দাম ৫৬০ কোটি টাকা, মালয়েশিয়ায় ৪৭টির দাম ৩১৩ কোটি টাকা এবং থাইল্যান্ডে ২৪টির দাম ১৯০ কোটি টাকা। ভিয়েতনামে কেনা চারটি ফ্ল্যাট-বাড়ির দাম ১৫৯ কোটি টাকা, ভারতে ১১টির দাম ১৩ কোটি টাকা এবং ফিলিপাইনে দু’টি সম্পদের দাম আট কোটি টাকা বলে জানা গেছে।
সাইফুজ্জামানের দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানের শুরুতে দুদক, সিআইডি ও এনবিআরের সমন্বয়ে সাত সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তবে পরে তা পুনর্গঠন করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দুদকের উপপরিচালক মো: মশিউর রহমানের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের টিম অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজ পরিচালনা করছে।
সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর বিবরণে জানা যায়, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্টরা পরস্পর যোগসাজশে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে নামসর্বস্ব কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এর মধ্যে ইমিনেন্ট ট্রেডার্সের নামে ২০ কোটি টাকা, ভিশন ট্রেডিং কর্তৃক ২৫ কোটি, রিলায়েবল ট্রেডিংয়ের নামে ১৫ কোটি, প্রোগ্রেসিভ ট্রেডিংয়ের নামে ২৩ কোটি, ক্রিসেন্ট ট্রেডার্সের নামে ২৫ কোটি এবং মডেল ট্রেডিংয়ের নামে ২১ কোটি টাকাসহ মোট ১২৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ছয়টি মামলা দায়ের করে দুদক। এসব মামলায় সাইফুজ্জামান ছাড়াও তার স্ত্রী ও ইউসিবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামান, প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আসামি করা হয়েছে।
একইভাবে, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে ঘুষ নিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আরো পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে প্রিন্সিপাল শাখার গ্রাহক থার্মেক্স নিট ইয়ার্ন লিমিটেড থেকে ৫২ কোটি টাকা, আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক এইচ এম শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে ৫৫ কোটি, জুবিলী রোড শাখার গ্রাহক ওয়েল মার্ট লিমিটেড থেকে পাঁচ কোটি টাকা, মহাখালী শাখার গ্রাহক সাইফ পাওয়ারটেক ও ই-ইঞ্জিনিয়ারিং পিএলসি থেকে ৪১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং ইউসিবিএল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার গ্রাহক আইকনএক্স সার্ভিস লিমিটেড থেকে ৬০ কোটি টাকাসহ মোট ২১৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া চকবাজার, পোর্ট, পাহাড়তলী ও বহদ্দারহাট শাখা হতে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাতের দায়ে চারটি মামলা, ৫৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে আটটি মামলা এবং ৪৬ কোটি ৭৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাতটি মামলা দায়ের করা হয়।
সম্পদ ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে আদালতের আদেশে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আটটি দেশে থাকা ৩৩০টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দ করা হয়। এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রে তার নামে থাকা দু’টি কোম্পানিতে করা বিনিয়োগ অবরুদ্ধের আদেশও দেয়া হয়। এসব সম্পদ ও বিনিয়োগের মোট পরিমাণ প্রায় দুই হাজার ৩২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে তার জেডটিএস প্রোপার্টিজ ও তানয়ীম প্রোপার্টিজে করা বিনিয়োগ রয়েছে, যেখানে শুধু তানয়ীম প্রোপার্টিজে বিনিয়োগের পরিমাণ ১২২ কোটি টাকা।
আদালতের আদেশে কম্বোডিয়ায় থাকা ১১৭টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট, ভারতে থাকা ৯টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট, আরব আমিরাতে থাকা ৫৯টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট, ভিয়েতনামে থাকা ৩০টি অ্যাপার্টমেন্ট ও তিনটি ফ্ল্যাট, মালয়েশিয়ায় থাকা ৪৭টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট, থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে থাকা ২৩টি বাড়ি ও ফ্ল্যাট এবং ফিলিপাইনের ম্যানিলায় থাকা দু’টি ফ্ল্যাট জব্দ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবরে দেয়া আদেশে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী রুকমীলা জামানসহ পরিবারের সদস্যদের নামে যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট ও জমিসহ স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়। এসব সম্পদ ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ক্রয় করা হয়েছিল, যখন তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। এর আগে তিনি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিচালক ছিলেন।
তার স্ত্রী রুকমীলা জামান ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ছিলেন এবং এই ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্য দিকে, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে আদালতের অপর এক আদেশে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবারের নামে থাকা ৩৯টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) করা হয়। এ ছাড়া, দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১০২ কোটি টাকার শেয়ার এবং ৯৫৭ বিঘা জমি জব্দের আদেশও দেয় আদালত। ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট দুদক কর্মকর্তারা বলেন, দুদকের নেতৃত্বে সিআইডি ও এনবিআরসহ ৯ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত একটি টাস্কফোর্স কঠোর পরিশ্রম করছে। বিদেশী সম্পদের বিষয়ে আদালতের আদেশক্রমে ক্রোকাদেশ সংশ্লিষ্ট দেশে পাঠানো হয়েছে, পাশাপাশি এমএলএআর-ও পাঠানো হয়েছে। দুদক আইন ও বিধি অনুসরণ করে তার করণীয় সব কাজ করছে, যা এখনো চলমান।