চাঁ’নবাবগঞ্জের তিনটি আসন ধরে রাখতে চায় বিএনপি, পুনরুদ্ধার লড়াইয়ে জামায়াত
Printed Edition
মিজানুর রহমান কুটু চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী লড়াই মূলত দলীয়ভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দল সংখ্যায় বেশি হলেও বাস্তবতায় নির্বাচনটি পরিণত হয়েছে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা- এই দুই প্রতীকের মধ্যেই। স্বতন্ত্র প্রার্থী না থাকায় এবারের নির্বাচন আদর্শ, সংগঠন ও দলীয় ভোটব্যাংকের লড়াই হিসেবেই দেখছেন ভোটার এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনে ৯টি রাজনৈতিক দলের মোট ১৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে কাগজে-কলমে বহু দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হলেও মাঠের লড়াইয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনে ছয় প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। তারা হলেন বিএনপির অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া, জামায়াতের মাওলানা ড. কেরামত আলী, ইসলামী ফ্রন্টের নবাব মো: শামসুল হোদা (মোমবাতি), জাতীয় পার্টির আফজাল হোসেন (লাঙ্গল), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের আব্দুল হালিম (ছড়ি) এবং ইসলামী আন্দোলনের মনিরুল ইসলাম (হাতপাখা)।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক শাহজাহান মিয়া একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। সাবেক চারবারের সংসদ সদস্য এই হেভিওয়েট প্রার্থী বয়সের ভার উপেক্ষা করে সরব প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে তার শক্ত অবস্থান রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এখানকার একটি বড় অংশের হিন্দু ভোট এবং আওয়ামী লীগের নীরব ভোট তার পক্ষে যেতে পারে।
অন্য দিকে জামায়াতের প্রার্থী ড. কেরামত আলী একজন পরিপক্ব ও পরিচ্ছন্ন ইমেজের নেতা। শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং রাজশাহী মহানগর আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেতা এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। সজ্জন ও ভদ্র ব্যক্তি হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এই আসনে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে- এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে আর কোনো দ্বিমত নেই।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (নাচোল-গোমস্তাপুর-ভোলাহাট) আসনে পাঁচজন দলীয় প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- বিএনপির আমিনুল ইসলাম (ধানের শীষ), জামায়াতের ড. মিজানুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলনের ডা: ইব্রাহিম খলিল (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির খুরশিদ আলম বাচ্চু (লাঙ্গল) এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাদিকুল ইসলাম (কাস্তে)।
বিএনপির আমিনুল ইসলাম দুইবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। যদিও তার মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলের ভেতরে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি একক প্রার্থী হিসেবেই মাঠে রয়েছেন। দলীয় ভোটের পাশাপাশি হিন্দু ও আওয়ামী লীগপন্থী ভোট তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী ড. মিজানুর রহমান একজন শিক্ষিত, বিনয়ী ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। স্থানীয় একটি কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি জামায়াতের রাজনীতির সাথে যুক্ত। এর আগে তিনি রহনপুর পৌরসভার মেয়র পদে দুইবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এ আসনে ভাসমান ভোটের ওপর নির্ভর করছে জয়পরাজয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনটি এবারের নির্বাচনে এই জেলার সবচেয়ে আলোচিত ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এখানে পাঁচজন প্রার্থী রয়েছেন। তারা হলেন- বিএনপির হারুনুর রশীদ, জামায়াতের নুরুল ইসলাম বুলবুল, ইসলামী আন্দোলনের মনিরুল ইসলাম, জেএসডির (রব) ফজলুর রহমান খান এবং গণ অধিকার পরিষদের শফিকুল ইসলাম।
বিএনপির হারুনুর রশীদ চারবারের সংসদ সদস্য এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। পারিবারিক ও দলীয় ভোটব্যাংকের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের একটি অংশের ভোট তার দিকে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকেই।
এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী নুরুল ইসলাম বুলবুল এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত মুখ। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পরও এলাকায় সক্রিয় থেকে তিনি নিজেকে এ অঞ্চলের একজন ‘আপন মানুষ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন মহলে বলা হচ্ছে, বুলবুলের পক্ষে জোয়ার উঠেছে, যা প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভোটাররা ব্যক্তির চেয়ে দল, আদর্শ ও ইশতেহারকে গুরুত্ব দেবেন। নতুন ভোটার, দলীয় ভোট, সংখ্যালঘু ভোট এবং আওয়ামী লীগের নীরব ভোট- এই চার উপাদানের ওপর শেষ মুহূর্তের হিসাব নির্ভর করছে। ফলে তিন আসনে ভোট গ্রহণের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ফলাফল কী হবে ধারণা করতে পারছেন না কেউ।