চট্টগ্রাম বন্দরে চাপ কমাতে মোংলার ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ

শাহ আলম নূর
Printed Edition

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দেশের প্রধান আমদানি-রফতানি কেন্দ্র। জাতীয় অর্থনীতির বেশির ভাগ বাণিজ্য এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু এককেন্দ্রিকতা, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, সীমিত সক্ষমতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় এ বন্দরের ওপর চাপ দিন দিন বাড়ছে। এতে পণ্য পরিবহন ও ছাড়করণে ব্যয় ও সময় বাড়ছে। এমন অবস্থায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে দেশীয় শিল্প ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার এখন চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে বিকল্প বন্দর ব্যবহারে উৎসাহ, নতুন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, আধুনিক টার্মিনাল স্থাপন, নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ২৪ ঘণ্টা বন্দরকার্যক্রম চালু রাখা।

তথ্যে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রফতানি পণ্য ওঠানামা হয়। বাকি একাধিক বন্দর দিয়ে মাত্র ১০ শতাংশ আমদানি, রফতানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে ২০২৪ সালে মোট ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ কনটেইনার (প্রতিটি ২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে) হ্যান্ডেল করা হয়েছে। একই সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১২ কোটি ৩৯ লাখ ৮৬ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৩ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সংখ্যা ছিল ৩০ লাখ ৫০ হাজার ৭৯৩। কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ছিল ১২ কোটি দুই লাখ ৩০ হাজার ২৯৩ টন। এক বছরের ব্যবধানে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। একই সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ এসেছে ৩৮৬৭টি। সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই সক্ষমতা দ্বিগুণ বাড়ানো। বাংলাদেশকে ইকোনমিক হাব, ম্যানুফ্যাকচারিং হাব করতে হলে, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিই হচ্ছে অন্যতম পূর্বশর্ত।

এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো: আবদুর রহমান খান বলেছেন, মোংলা বন্দরের ব্যবহার বাড়াতে পারলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমবে এবং যানজট ও জাহাজজট হ্রাস পাবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যস্ততা অনেক বেশি। এর ফলে সেখানে যানজট ও জাহাজজটও বেশি। কিন্তু মোংলা বন্দরের ব্যবহার তুলনামূলক অনেক কম। মোংলার ব্যবহার বাড়ানো গেলে চট্টগ্রামের ওপর চাপ কমবে, জটও কমবে এবং একইসাথে মোংলা বন্দর ও মোংলা কাস্টমস হাউজের আয়ও বাড়বে। এজন্য আমরা নানা উদ্যোগ নিয়েছি।

তিনি বলেন, আমরা মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো জানতে চাই। যেমন মোংলা বন্দরের সক্ষমতা কতটুকু, কতটুকু ব্যবহার হচ্ছে, এবং কিভাবে তা আরো বাড়ানো যায়। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমস্যাও জানার জন্য সরেজমিন পরিদর্শন করছি। আমাদের এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দরের চাপ কমাতে সরকার প্রথমেই গুরুত্ব দিচ্ছে বিকল্প সমুদ্রবন্দরগুলোর কার্যকর ব্যবহারে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মোংলা ও বরিশালের কাছাকাছি পায়রা বন্দর ব্যবহারে ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। মোংলা বন্দরের পরিকাঠামো এবং সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। তবে চট্টগ্রামমুখী প্রবণতা এতটাই বেশি যে, তা এখনো যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে একদিকে যেমন পণ্যজট তৈরি হয়, তেমনি বাণিজ্য ব্যয়ও বাড়ে। মোংলা বন্দর ব্যবহার করলে সময় ও খরচ দুইই কমে যাবে। এনবিআরের উদ্যোগে সম্প্রতি মোংলায় একটি উচ্চপর্যায়ের টিম সফর করে, যাতে বন্দর ব্যবহার বিষয়ে সিঅ্যান্ডএফ ও ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা এবং বন্দর পরিদর্শন করা হয়। কাস্টমস ও শুল্ক কার্যক্রমের ডিজিটালাইজেশন, ট্রাক টার্মিনাল ও সংযোগ সড়ক উন্নয়নের মাধ্যমে মোংলাকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিকল্প বন্দরে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ হলো মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ। কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলায় নির্মাণাধীন এই বন্দরটি ২০২৬ সালের মধ্যে চালু হওয়ার লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলছে। জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার সহযোগিতায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি চালু হলে এটি হবে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর যেখানে বড় কনটেইনার জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে বড় জাহাজ ঢুকতে পারে না, ফলে ট্রান্সশিপমেন্ট করতে হয়। এতে সময় ও ব্যয় দুই-ই বাড়ে। মাতারবাড়ী চালু হলে সিঙ্গাপুর বা কলম্বো ঘুরে আসার প্রয়োজন হবে না। এতে দেশের বাণিজ্য প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের চাপও অনেকটা কমবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন এ প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কক্সবাজার-মাতারবাড়ী ২৬ কিলোমিটার চার লেনের সংযোগ সড়ক। এই সড়ক ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হবে, যা চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর চাপ কমাবে। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াতে সরকার বে টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বিশ্বব্যাংক ৬৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের মাধ্যমে এ প্রকল্পে অংশ নিচ্ছে। এই টার্মিনাল নির্মাণের ফলে অতিরিক্ত জেটি, আধুনিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম এবং বড় জাহাজের জন্য নোঙরের সুযোগ তৈরি হবে। তথ্যে দেখা যায়, বর্তমানে একটি জাহাজ বন্দর থেকে পণ্য খালাস করে বের হতে তিন থেকে পাঁচ দিন সময় নেয়। নতুন টার্মিনাল চালু হলে এ সময় ৫০ শতাংশ কমে আসবে। এতে বন্দরের ‘টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম’ কমবে এবং আরো বেশি জাহাজ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি পণ্যজটও অনেকটাই হ্রাস পাবে। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যতম সমস্যা ছিল সময় সীমাবদ্ধতা। অফিস চলাকালে কাস্টমস ও বন্দরকার্যক্রম পরিচালনা হতো, ফলে ছুটির দিনে পণ্য আটক থাকত। সরকার এ সমস্যা সমাধানে এখন ২৪ ঘণ্টা এবং সপ্তাহান্তেও কার্যক্রম চালু রেখেছে। কাস্টমস, কনটেইনার টার্মিনাল এবং অন্যান্য সং

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরে একাধিক অগ্নিকাণ্ড ও রাসায়নিক বিস্ফোরণের ঘটনায় বন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানিও ঘটেছে। সরকার এ সমস্যা সমাধানে ঝুঁকিপূর্ণ ও দাহ্যপণ্য ডিপোতে সরিয়ে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। এনবিআর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মোট ১৫ ধরনের বিশেষ পণ্য এখন থেকে নির্ধারিত বেসরকারি ডিপোতে রাখা হবে, বন্দরের মূল এলাকায় নয়। এতে বন্দরের ভেতরে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং যেকোনো ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাস পাবে।