স্যার সলিমুল্লাহ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল
আবারো পদোন্নতির তালিকায় আওয়ামী আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের আমলে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে স্বাস্থ্যখাতকে অস্থিতিশীল করে সুযোগ-সুবিধা ও পদোন্নতি বাগিয়ে যোগ্যদের বঞ্চিতকারী চিকিৎসকরা এখনো পদোন্নতির তালিকায় সামনের সাড়িতে। ন্যূনতম যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এসব চিকিৎসক কেবল ক্ষমতার জোরে সুবিধা নিয়েছেন। শুধু পদোন্নতি নয়- ঠিকমতো অফিস না করা এবং নিজ নিজ বিভাগে সরকারি টাকা আত্মসাতের সাথেও জড়িত তারা। এই চিকিৎসকরাই এখন নতুন রাজনৈতিক সূত্র ধরে নিজ নিজ বিভাগে আগের দাপট বজায় রেখেছেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, অনিয়ম-দুর্নীতির জলজ্যান্ত নমুনা হলেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের (এসএসএমসি) ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা: তারেক মাহবুব খান। ২০০১ সালে ২০তম বিসিএসে চাকরিতে যোগদান করা এই চিকিৎসক ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত লিয়েনে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করেছিলেন। সিনিয়র-স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে, রাষ্ট্রপতির প্রোমার্জনা না নিয়েই আওয়ামী সংশ্লিষ্টতার জোরে ২০১৬ সালে ভাইরোলজি বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে সেই বছরেই যোগদান করেন। কিন্তু সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রির পাশাপাশি সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া আবশ্যক। তবে কারো চাকরির ১৫ বছর কিংবা বয়স ৫০ বছর পূর্ণ হলে তিনি সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা হতে অব্যহতি পেয়ে থাকেন, কিন্তু এরূপ ক্ষেত্রে তিনি পঞ্চম গ্রেডের ঊর্ধ্বে পদোন্নতি পাওয়ার জন্য বিবেচিত হন না। ২০১৬ সালের ৩ জুলাই ডা: তারেকের বয়স ৫০ বছর কিংবা তার সরকারি চাকরির বয়স ১৫ বছর পূর্ণ হয়নি। চাকরিবিধি অনুযায়ী সেই তারিখের প্রজ্ঞাপনে তার সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি অবৈধ হয়েছে। রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনা না নিয়ে এবং যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়েছিলেন আওয়ামী ক্ষমতা বলে।
এই একই ব্যক্তি পরে ২০২০-এর ২৪ নভেম্বর সিনিয়র-স্কেল পরীক্ষায় পাস করা (রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনা ছাড়াই) ছাড়াই রাজনৈতিক ক্ষমতায় চতুর্থ গ্রেড পদে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে যান। ডা: তারেক মাহবুব খান চাকুরির নিয়ম-বিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে পরপর দুইটি পদোন্নতি বাগিয়েছেন। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পরও তিনি বহাল তবিয়তে আছেন, এমনকি সম্প্রতি তিনি ভাইরোলজি বিষয়ে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য ফিট লিস্টেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। কয়েকজন ভাইরোলজির শিক্ষক জানিয়েছেন, বিধি ভঙ্গ করে পদোন্নতির কারণে তার দুইটি পদোন্নতি বাতিল করে গৃহীত আর্থিক সুবিধা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত নেয়া উচিৎ ছিল। তা না করে বরং তিনি অধ্যাপক পদে পদোন্নতির নেয়ার তৎপরতা চালাচ্ছেন।
স্বাস্থ্য খাতে আওয়ামী আমলের ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতির আরো একজন উদাহরণ হলেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে একটানা প্রায় ১৭ বছর সহযোগী অধ্যাপক (মাইক্রোবায়োলজি) পদে কর্মরত ডা: শামশাদ জাহান সুমু। শেখ হাসিনার দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়তার সূত্রে অবৈধভাবে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি বাগিয়েছিলেন তিনি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, রাষ্ট্রীয়ভাবে বিদেশ সফরের প্রশ্ন আসলে তিনিই সব সফরে সুযোগ পেতেন। কিন্তু ২০০৬ সাল পর্যন্ত ডা: শামশাদ সাবেক বিএনপি নেতা কেএম ওবায়দুর রহমানের ভাগ্নী পরিচয়ে চলতেন। কিন্তু ২০০৭ সালের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী আমলে ওই পরিচয় গোপন রেখে সর্বত্র পৈতৃক সূত্রে শেখ হাসিনার সাথে আত্মীয়তার পরিচয়ে চলতেন। সম্প্রতি তিনি পুনরায় বিএনপির নেত্রী শামা ওবায়েদের মামাতো বোন এবং জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সম্পাদক ইয়াসমিন আরা হকের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে মাইক্রোবায়োলজিতে দাপট বজায় রেখেছেন।
১৯৭৬ সালে জন্মগ্রহণকারী ডা: শামশাদ ১৯৯১ ও ১৯৯৩ সালে যথাক্রমে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। এই হিসাবে তার অনেক ইয়ারমেট ১৯৯৯ সালে এমবিবিএস পাস করে থাকলেও তিনি ২০০২ সালে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। পরে তিনি ২০০৬ সালে ২৫তম বিসিএসে চাকরিতে যোগদান করেন। ২০০৮ সালে তিনি সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে বদলি হয়ে আসেন। একই বছরে তিনি বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি থেকে (তখনকার নাম বিএসএমএমইউ) মাইক্রোবায়োলজি পাস করেন।
২০০৯ সালে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের সাথে সাথে ডা: শামশাদও শেখ হাসিনার বোন পরিচয়ে সোহরাওয়র্দীতে দাপট দেখাতে শুরু করেন। বিভাগীয় প্রধানদের তোয়াক্কা না করে কর্মস্থলে নিজের ইচ্ছা মতো আসা-যাওয়া করতেন। শেখ হাসিনার ক্রমাগত ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার সাথে সাথে ডা: শামশাদও ক্রমাগত বেপরোয়া হয়ে উঠেন এবং সরকারি অর্থে বিদেশ ভ্রমণসহ আইন-বিধি বহির্ভূতভাবে পদোন্নতিও বাগিয়ে নেন। ডা: শামশাদ বিগত ২০১৩ সালে মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ের ১০ নং ক্রমিকে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। এ সময়ে তিনি পদোন্নতির জন্য সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছিলেন না, কিন্তু তৎকালীন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরসম্পর্কীয় বোন হিসেবে জোর খাটিয়ে পদোন্নতি প্রত্যাশী ডা: আব্দুল্লাহ ইউসুফের নাম বাদ দিয়ে নিজের নাম তালিকাভুক্ত করান।
স্বাস্থ্য ক্যাডারের চাকরিবিধি অনুযায়ী কোনো বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রির পাশাপাশি সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অথবা চাকরিকাল ১৫ বছর অথবা বয়স ৫০ বছর পূর্তির আবশ্যকতা রয়েছে। তবে এই দুই শর্তের কোনোটি না থাকলে বিশেষ বিবেচনায় রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনা দিয়ে পদোন্নতি নিতে পারেন। অবশ্য এ বিষয়টিকে বিধিবহির্ভূত আখ্যায়িত করে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা: নেয়ামত হোসেন রিপন দীর্ঘদিন যাবৎ লেখালেখি করে আসছেন। তবে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা থেকে রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনায় পদোন্নতির বিষয়টি বিধিসম্মত গণ্য করলেও ডা: শামশাদের সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনা নেয়া হয়নি। তা ছাড়া ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত তার চাকরিকাল ১৫ বছর কিংবা বয়স ৫০ বছর পূর্ণ হয়নি। ফলে তার সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি সম্পূর্ণরূপে বিধিবহির্ভূত ও অবৈধ এবং বাতিলযোগ্য হয়েছে। আর সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি বৈধ না হলে পরবর্তী (সহযোগী অধ্যাপক) পদোন্নতিও অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে।
এই তালিকায় আরো আছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ডা: নাশাত জাবিন দিশা। তিনি বিগত আওয়ামী আমলে অবসর নেয়ার পর দ্বিতীয় দফায় চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডা: সেলিম রেজার সহযোগী এবং সরকারি লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের সহায়তাকারী। একই বিভাগের আরেক দুর্নীতিগ্রস্ত চিকিৎসক ডা: সোহেল মাহমুদেরও প্রিয়ভাজন দিশা। ফরেনসিক মেডিসিনে প্রতিটি মেডিকো লিগ্যাল প্রতিবেদনে ঘুষ নিয়ে চাহিদা অনুযায়ী প্রতিবেদন দেয়া, রেপ ভিক্টিমের ভেজাইনাল স্পেসিমেন বদলে মর্গের অন্য ফিমেল বডি থেকে স্পেসিমেন পাঠিয়ে ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ফরেনসিক বিভাগের মর্গ, ফ্যাকাল্টি ও ডিএমএফ কোর্সের শিক্ষার্থীদের থেকে নিয়মিত মাসিক চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে দিশার বিরুদ্ধে। এখনো একই অপকর্ম করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দিশা আগের যোগাযোগ রক্ষা করে অবৈধ অর্থ আদায় করে যাচ্ছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। ডা: সেলিম রেজা ও ডা: নাশাত জাবীনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করলেই তাদের অ্যাকাউন্টে অনেক অবৈধ অর্থ লেনদেনের প্রমাণ যাওয়া যাবে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। ২০১৭ সালে সোহরাওয়ার্দীতে যোগদান করলেও কখনো সংযুক্তি ও কখনো পদে বদলে সোহরাওয়ার্দীতে রয়ে যান। জুলাই আন্দোলনে সোহরাওয়ার্দীতে আসা শহীদদের সংখ্যা কমিয়ে লাশ গুমের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
সোহরাওয়ার্দীর সাবেক শিক্ষার্থী হওয়ায় ৫ আগস্টের পর অর্থের বিনিময়ে ড্যাবের সদস্য পদ পেয়ে যান দিশা। স্বাচিপের লাইফ মেম্বারের তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে ২০১৯ সাল থেকে ড্যাবের মেম্বার বনে যান তিনি। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে ড্যাব সদস্য পদ পেতে বিএমডিসি নাম্বার ভুল দিলেও তাতে আপত্তি করেনি সংগঠনটি। ২০২৩ সালের ১ মার্চ তিনি সহকারী অধ্যাপক পদে যোগদান করলেও ২০২৫ সালে নিয়মানুসারে কোনোভাবেই সহযোগী অধ্যাপক পদে যোগ্য নন তিনি। এমনকি ফিডার পদে ন্যূনতম কর্মকালের মেয়াদও পূরণ করেননি। অথচ ডা: নাশাত জাবীন সহযোগী অধ্যাপকের পদোন্নতির খসড়া তালিকা বা ফিট লিস্টে ৪ নং ক্রমিকে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছেন।