আরো তীব্র হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

Printed Edition
first-1
তেহরানে কুদস দিবসের সমাবেশে ইসরাইলি বিমান হামলা হলে বিক্ষোভস্থল থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখছেন আন্দোলনকারীরা : ইন্টারনেট

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • ইরাকে ভূপাতিত মার্কিন স্ট্র্যাটো ট্যাংকারের ৪ ক্রু নিহত
  • ইসরাইলে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ইরানের

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ আগামী সপ্তাহে আরো জোরদার করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল শুক্রবার সকালে ফক্স নিউজের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আগামী সপ্তাহে ইরানে ‘খুবই কঠোর’ আঘাত হানার পরিকল্পনা করেছে। ফক্স নিউজে প্রচারিত ট্রাম্পের এই মন্তব্যটি এর আগে একই দিন সকালে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেয়া একটি পোস্টেরই প্রতিধ্বনি। সেখানে ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে ইঙ্গিত করে কঠিন পরিণতির হুঙ্কার দেন তিনি।

এ দিকে ট্রাম্প যখন আগামী সপ্তাহে ইরানে কঠোর হামলা চালানোর হুমকি দিলেন, তখন একই দিনে তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ গতকালই তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চসংখ্যক হামলার দিন হবে বলে হুমকি দিয়েছেন।

অন্য দিকে ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। তেলআবিবসহ ইসরাইলের বিভিন্ন স্থানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষয়ক্ষতির কথাও সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিম ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবান একটি কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় স্ট্র্যাটোট্যাংকারে থাকা ছয় ক্রু’র চারজন প্রাণ হারিয়েছে। ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠী এটি ভূপাতিতের দাবি করেছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা হাজারো মার্কিন সেনা ইরানের হামলা থেকে বাঁচতে স্থানীয়দের মানবঢাল বানিয়ে হোটেল ও বাসাবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে বলে জানা গেছে।

ইসরাইলে দফায় দফায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : ইরান থেকে ইসরাইলের দিকে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে গতকাল শুক্রবার জানিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। এতে দেশটির উত্তরাঞ্চলে দু’জন আহত হয়েছেন বলে জানায় তেলআবিবের জরুরি সেবা কর্তৃপক্ষ। ইসরাইলি সেনাবাহিনী অফিসিয়াল টেলিগ্রাম চ্যানেলে এক বিবৃতিতে জানায়, ‘আজ ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ)। ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতের হুমকি প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করছে। এর কিছুক্ষণ পর ইসরাইলে একই ধরনের আরো একটি সতর্কবার্তা জারি করা হয়। প্রাথমিক সতর্কবার্তা বা সাইরেন বাজার পর ইসরাইলের জরুরি পরিষেবা ম্যাগেন ডেভিড অ্যাডম জানায়, এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কোনো জরুরি কল আসেনি। তবে দ্বিতীয় সতর্কবার্তার পর তারা জানায়, দেশটির উত্তরাঞ্চলে দুই ব্যক্তি আহত হয়েছে এবং তাদের চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। উদ্ধারকারীরা জানান, শেল বা বিস্ফোরণের ধাতব টুকরার আঘাতে এক ৩৪ বছর বয়সী নারী গুরুতর আহত হয়েছেন।

ইরাকে ভূপাতিত মার্কিন স্ট্র্যাটোট্যাংকারের ৪ ক্রু নিহত : ইরানে যুদ্ধের দায়িত্বে থাকা মার্কিন বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, পশ্চিম ইরাকে তাদের কেসি-১৩৫ রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় স্ট্র্যাটোট্যাংকারে থাকা ছয় ক্রু’র চারজন প্রাণ হারিয়েছে। গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে তারা এ চারজনের নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করে, বলছে আলজাজিরা। যুদ্ধরত বিমানে জ্বালানি ভরায় দামি এই স্ট্র্যাটোট্যাংকারগুলোই মেরুদণ্ডের ভূমিকা পালন করে।

বাকি দুই ক্রু’র খোঁজে এখনো অভিযান চলছে, বলেছে সেন্টকম। কিভাবে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিলেও নিজেদের দু’টি বিমানের মধ্যে সংঘাত বা খুব কাছাকাছি চলে আসার পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় ওই কেসি-১৩৫ ভূপাতিত হতে পারে বলে তাদের আগের বিবৃতিতে আভাস দেয়া হয়েছিল।

দ্বিতীয় বিমানটি ‘নিরাপদে অবতরণ করেছে’, বলেছিল তারা। ‘শত্রুপক্ষের হামলা কিংবা মিত্রদের ভুলক্রমে হামলার কারণে এটি ঘটেনি,’ ভাষ্য মার্কিন সেন্টকমের।

তবে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক বলছে, তারাই যুক্তরাষ্ট্রের ওই কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকারটি ভূপাতিত করেছে। নিজেদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেয়া বিবৃতিতে ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স বলে, তাদের যোদ্ধারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা দিয়ে বিমানটিকে নিশানা করলে সেটি ভূপাতিত হয়।

যুদ্ধের একেবারে প্রথমদিকে কাতারে তিনটি মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পাল্টায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সেসময় ইরান মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছিল, তার মধ্যেই কুয়েতি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভুলে ওই বিমানগুলো ভূপাতিত হয় বলে পরে দাবি করে ওয়াশিংটন।

ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করার হুঁশিয়ারি : ইরানকে নিয়ে ফের কড়া হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে তিনি লিখেন, আমরা সামরিক, অর্থনৈতিকসহ সব দিক দিয়ে ইরানের সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবো। পোস্টে তিনি আরো লিখেছেন, ইরান গত ৪৭ বছর ধরে সারা বিশ্বে নিরীহ মানুষ হত্যা করে আসছে। আর এখন আমি, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাদের হত্যা করছি। এটি করতে পারা আমার জন্য বড় সম্মানের। এ ছাড়া ট্রাম্প নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি খবরের সমালোচনা করে বলেন, ইরানের নৌবাহিনী শেষ। বিমানবাহিনী কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, সবকিছু ধ্বংস করা হচ্ছে। এমনকি তাদের নেতাদেরও আর দেখা যাচ্ছে না।

এ ছাড়া ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হামলার প্রথম দিনই আহত হয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, আমার মনে হয়, সেটাই হয়েছে। আমার ধারণা তিনি আহত, হয়তো কোনোভাবে তিনি এখনো বেঁচে আছেন। ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী পার হতে বিভিন্ন দেশের জাহাজগুলোকে রক্ষা করবে।

সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইরান প্রসঙ্গে দোলাচলে আছেন, যদিও তিনি ইরানের সামরিক ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রশংসা করেছেন। তবে তিনি দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে পারছেন না। এর আগে গত বুধবার কেন্টাকির হেবরনে ইরানযুদ্ধ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা জিতেছি। কিন্তু কাজ শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে এ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। জবাবে ইসরাইলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালাতে থাকে ইরান।

তেহরানে কুদস দিবসের মিছিলে ড্রোন হামলায় নারী নিহত : ইরানের রাজধানী তেহরানে ফিলিস্তিনিদের সাথে সংহতি জানিয়ে আয়োজিত বার্ষিক আল-কুদস দিবসের মিছিলে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাথমিকভাবে এক নারীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে মুখরিত ফেরদৌসি চত্বরে এই বিস্ফোরণ ঘটে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। প্রত্যক্ষদর্শীরা একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন বলে জানান।

এর আগে, ইসরাইল ওই এলাকা খালি করার হুমকি দেয়। হুমকি দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই এই ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলার ফলে ছিটকে আসা স্পি­ন্টারের আঘাতে এক নারী নিহত হয়েছেন। এদিকে, আলজাজিরা অ্যারাবিক তেহরানে বিক্ষোভকারীদের একটি সমাবেশের মাত্র কয়েক মিটার দূরে বিমান হামলার খবর দিয়েছে। তবে হামলাটি ঠিক কোথায় হয়েছে বা এতে আরো কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান হামলা সত্ত্বেও তেহরান এবং অন্যান্য শহরে কুদস দিবসের স্মরণে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তেহরানের সমাবেশে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলি লারিজানিসহ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন।

রাতেই ইরানে সর্বোচ্চসংখ্যক হামলার হুমকি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর : মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরানে শুক্রবার রাতেই সর্বোচ্চসংখ্যক হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র। ভার্জিনিয়ার আর্লিংটনে গতকাল শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কথা বলেন। পিট হেগসেথ বলেন, এদিন আবারো ইরান এবং তেহরানের আকাশে আমেরিকার চালানো সর্বোচ্চসংখ্যক হামলার দিন হবে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে এ পর্যন্ত ইরানের ১৫ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এটাকে অনেক বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্যে হোটেল ও বাসাবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে হাজারো মার্কিন সেনা : মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং গতিবিধি জানানোর জন্য ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ডবাহিনীর (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখা। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, বর্তমানে হাজার হাজার মার্কিন সেনাসদস্য ওই অঞ্চলের বিভিন্ন হোটেল ও ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে আত্মগোপন করে আছে। ওয়াশিংটন নিজেদের স্বার্থে স্থানীয় আরব নাগরিকদের ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছে বলেও এতে অভিযোগ করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমেরিকানদের শনাক্ত করে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কোনো হোটেল বা বাসাবাড়িতে তাদের আশ্রয় না দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দিয়েছে আইআরজিসি। একই সাথে সাধারণ মানুষকে মার্কিন সেনাদের অবস্থানের আশপাশ থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। মার্কিন সেনাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের লুকিয়ে থাকার জায়গাগুলো সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেয়াকে একটি ‘ইসলামী দায়িত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছে ইরান। এই তথ্যগুলো পাঠানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট টেলিগ্রাম চ্যানেল ব্যবহারের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে বিবৃতিতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

ট্রাম্পের জয় আটকে দিচ্ছে যে সাত কারণ : ইরানের সাথে চলমান সঙ্ঘাত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি কঠিন কৌশলগত পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর তিনি দ্রুত বিজয়ের কথা বললেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা জটিলতার কারণে এই যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে স্পষ্ট বিজয়ের পথ সহজ নয়।

যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ : প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা সঙ্ঘাতের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো-পরিস্থিতির ওপর ওয়াশিংটনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে এই প্রণালী বন্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দ্রুত অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম বাড়ছে, যা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। সামরিকভাবে এই পথ খুলে দেয়াও সহজ নয়।

দুর্বল যুদ্ধ পরিকল্পনা : অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সঙ্ঘাত শুরু করার সময় ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে যথেষ্ট পরিকল্পনা করা হয়নি। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা জানতেন, ইরান আক্রমণের জবাবে হরমুজ প্রণালীকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

সামরিক ঝুঁকি : যুদ্ধের প্রভাব শুধু তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। ইরাকের আকাশে একটি মার্কিন ট্যাঙ্কার বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাও এই সঙ্ঘাতের ঝুঁকি সামনে এনেছে। এই বিমানটি যুদ্ধবিমানগুলোকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া : যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও আলোড়ন তৈরি করছে। ভার্জিনিয়া ও মিশিগানে সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে, যেগুলো তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যদিও এসব ঘটনার সাথে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত নয়, তবুও উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ পরিস্থিতিকে জটিল করছে।

যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে বিভ্রান্তি : ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যেও স্পষ্টতা নেই। কখনো বলা হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা হয়েছে, আবার কখনো যুদ্ধকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এই অস্পষ্টতা যুদ্ধের একটি পরিষ্কার ‘বিজয়ের বয়ান’ তৈরি করা কঠিন করে তুলছে।

নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রভাব : যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন। পরে তার ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হন। এই পরিবর্তন অনেকের কাছে যুদ্ধকে সরাসরি সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরে। তবে নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত সাফল্যের গল্প কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইসরাইল ফ্যাক্টর : যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত নিলেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি জটিলতা হলো ইসরাইলের অবস্থান। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন সরকার আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে। ফলে ওয়াশিংটন যুদ্ধ থামাতে চাইলে তেলআবিব সেই পথে হাঁটবে কি না-তা নিশ্চিত নয়।

পারমাণবিক প্রশ্ন : ট্রাম্প দাবি করেছেন, বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে যদি দেশটি তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ধরে রাখতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে আবারো সেই কর্মসূচি শুরু করার সম্ভাবনা থেকে যায়।

ইরানে জনবিদ্রোহ হয়নি : যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প ইরানের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত বড় কোনো গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষণ দেখা যায়নি। এতে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্যও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।