মাদরাসার শিক্ষাকাঠামোর সঙ্কট, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা- ৮

পাঠ্যবই রচনায় আলাদা বোর্ড ও প্রশিক্ষণের আওতা বৃদ্ধির তাগিদ

গবেষণায় দেখা গেছে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই রচনা থেকে শুরু করে সিলেবাস প্রণয়নেও বিশেষ কোনো বিশেষত্ব বা স্বাতন্ত্র্য নেই।

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড
বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড | সংগৃহীত

দেশের চারটি পৃথক শিক্ষাকাঠামোর মধ্যে মাদরাসা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে শিক্ষার্থীদের অন্যদের তুলনায় আলাদাভাবে গড়ে তোলা। বিদ্যমান এই ধারাগুলোর মধ্যে স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনারেল শিক্ষা, আলিয়া মাদরাসার জেনারেল ও ইসলামী শিক্ষার সমন্বিত ধারা, কওমি মাদরাসা শিক্ষা ধারা এবং ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা ধারা। এই ধারাগুলোর মধ্যে বিশেষ করে মাদরাসা শিক্ষার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মানসিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক ও মানবীয় বিষয়ে সর্বাঙ্গীণ বিকাশ ও উন্নয়ন সাধন। কিন্তু মাদরাসার বিভিন্ন পর্যায়ে যে পাঠ্যবই পড়ানো হয় এবং সে সিলেবাসের আলোকে তাদের মূল্যায়ন পরীক্ষা নেয়া হয় সেখানে আমূল পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই রচনা থেকে শুরু করে সিলেবাস প্রণয়নেও বিশেষ কোনো বিশেষত্ব বা স্বাতন্ত্র্য নেই। স্কুল কলেজের পাঠ্যবই যেভাবে রচনা করা হয় কিংবা সেখানে যেভাবে পরীক্ষা পদ্ধতির আয়োজন থাকে সেভাবেই মাদরাসাগুলোর শ্রেণিভিত্তিক বই রচনা বা পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন জরুরি। একইসাথে মাদরাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়েও জোর তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম ছিদ্দিকুর রহমান নিজামী সম্প্রতি তার এক গবেষণাভিত্তিক প্রবন্ধে লিখেছেন, মাদরাসাগুলোর স্বকীয়তা রক্ষায় ইবতেদায়ি থেকে শুরু করে সবপর্যায়েই শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, পাঠ্যসূচি নির্ধারণ এবং মাদরাসার পাঠ্যবই রচনাতে পৃথক বোর্র্র্ড থাকা বাঞ্ছনীয়। সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার সাথে মিল রেখে মাদরাসার জন্য পাঠ্যবইয়ের বিষয় তৈরি কিংবা এর পরিমার্জন করা হলে সেখানে মাদরাসা তার মূল বৈশিষ্ট্যই হারাবে। তাই মাদরাসা শিক্ষার ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিভিন্ন শ্রেণিভিত্তিক পাঠ্যবই রচনায় বিদ্যমান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) আদলে পৃথকভাবে শুধু মাদরাসার জন্য এমন একটি বোর্ড গঠন করা যায় কি না সেটিও সময়ের প্রয়োজনে এখন বিবেচনার দাবি রাখে। তিনি এটাও মত দিয়েছেন যে প্রয়োজনে এনসিটিবিতেই মাদরাসার বইগুলো দেখভালের জন্য পৃথক একটি উইং খোলা যায় কি না সরকারকে ভেবে দেখা দরকার। এই উইংয়ের মধ্যে শুধুমাত্র মাদরাসা ব্যাকরাউন্ডের দক্ষ ও অজিজ্ঞ জনবল নিয়োগ দেয়ার জন্য তিনি সুপারিশ করেন।

এ দিকে মাদরাসা শিক্ষাকে মূল ধারায় ধরে রাখতে এবং কাঠামোর মোলিকত্ব বজায় রাখতে উদ্যোগের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভিত্তি নড়বড়ে না হয়ে যায় সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখার বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্টজনেরা। সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার গোড়াতেই যেন কোনো গলদ না থাকে সেজন্য আরবির পাশাপাশি বাংলা, গণিত এবং ইংরেজির প্রাথমিক বিষয়েও তাদের ভিত্তি মজবুত করতে হবে। এ বিষয়ে সুপারিশ হলো আরবি বিষয়টি আবশ্যিক হিসেবে রাখার পরেও ইবতেদায়িতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো বাংলা, ইংরেজি এবং গণিতের সাধারণ বিষয়গুলোও আবশ্যিক রাখতে হবে।

ইসলামিক স্কলারদের মতে মাদরাসা শিক্ষা যেহেতু আলাদা একটি মর্যাদা ও বেশিষ্ট্যের দাবি রাখে কাজেই এর প্রাথমিক পর্যায় (ইবতেদায়ি) থেকেই শিক্ষার্থীদের ভাষা জ্ঞান ও এ বিষয়ে দক্ষতা অর্জনে এবং শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হবে। কেননা বিশুদ্ধ তেলাওয়াত (পঠন) মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রকৃতিগতভাবেই বিশুদ্ধ হওয়া অত্যন্ত জরুরি। অথচ এমন অনেক অভিযোগ আসে যে, মাদরাসায় পড়ালেখা করার পরেও অনেকের শুদ্ধ তেলাওয়াত হয় না। তাই শিশুদের তেলাওয়াত শেখার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া যাবে না। প্রয়োজনে ইবতেদায়ি স্তরে শুদ্ধ তেলাওয়াত শেখানোর জন্য ‘হাফেযুল কুরআন’ শিক্ষক নিয়োগের জন্য শর্তারোপ করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও নিয়োগকর্তাদের আরো সতর্ক থাকতে হবে। কেননা এমন অভিযোগ রয়েছে যে, অনেক মাদরাসায় কারি নিয়োগ দেয়া হলেও তাদের অনেকের তেলাওয়াত আবার শুদ্ধ হয় না।

অন্য দিকে ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতামত হচ্ছে ইবতেদায়ি স্তরের কোনো শ্রেণীতেই শিক্ষক সমিতি বা অন্য কোনো সমিতি কর্তৃক প্রণিত প্রশ্নপ্রত্র চলবে না। জেলা ইবতেদায়ি শিক্ষা কর্তৃপক্ষই এসব প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করবে এবং মাদরাসাগুলোকে সেখান থেকে সেগুলো সংগ্রহ করতে হবে। মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে সাধারণ শিক্ষাধারার ন্যায় ইবতেদায়ি শিক্ষার্থীদেরও বিভাগীয় উপপরিচালকদের পরিচালনায় জাতীয় পর্যায়ে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম ছিদ্দিকুর রহমান নিজামী মাদরাসা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরো বিজ্ঞানভিত্তিক করতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়েও জোর দিয়েছেন। বিশিষ্ট এই শিক্ষাবিদের মতে পিটিআইর আদলে মাদরাসা শিক্ষকদের জন্য পৃথক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে অথবা বিদ্যমান পিটিআইর মধ্যেই পৃথক একটি মাদরাসা উইং চালু করা যায়। একই সাথে শিক্ষকদের কর্মকালীন প্রশিক্ষণের আওতায় দুই মাসে একদিন করে সংশ্লিষ্ট এলাকার এটিইওর (সহকারী থানা শিক্ষা অফিসার) অধীনে বছরে ছয় দিন প্রশিক্ষণ নেয়ার বন্দোবস্তো করতে হবে। অবশ্য এ জন্য প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে সাধারণ এবং মাদরাসা উভয় ধারায় দক্ষ প্রশিক্ষিত এটিইও নিয়োগ দিতে হবে। যেসব শিক্ষক প্রশিক্ষণ শেষ করে ক্লাসরুমে ফিরে যাবেন তাদের ক্লাসগুলো নিয়মিত পরিবীক্ষণ বা মনিটরিংয়ের আওতায় রাখতে হবে।

সূত্র মতে শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, সম্প্রসারণ ও প্রকাশনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন ও বিকাশে সহায়তার জন্য ১৯৭৮ সালে ন্যাশনাল একাডেমি ফর প্রাইমারি এডুকেশন (নেপ) প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন বাস্তবতার আলোকে মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন ও বিকাশেও ন্যাশনাল একাডেমি ফর ইবতেদায়ি এডুকেশন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। অথবা নেপ-এর অধীনেই আলাদা মাদরাসা উইং সৃষ্টি করে দক্ষ জনবল দ্বারা সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেয়ার দাবি সংশ্লিষ্টদের।

ইবতেদায়ির পাশাপাশি মাদরাসার দাখিল এবং আলিম পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্যও পৃথকভাবে প্রশিক্ষণের আওতা বাড়ানোর ওপর তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষাবিদগণ। তাদের মতে, বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণের জন্য সারা দেশে ১০টি সরকারি প্রশিক্ষণ কলেজ রয়েছে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইইআর রয়েছে। টিচার্স ট্রেইনিং কলেজে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য রয়েছে তিন সপ্তাহব্যাপী কর্মকালীন প্রশিক্ষণ কোর্স এবং এইচএসটিটিআই (হায়ার সেকেন্ডারি টিচার্স ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট) তে কলেজ শিক্ষকদের জন্য রয়েছে ৫৬ দিনের কর্মকালীন উচ্চতর প্রশিক্ষণ কোর্স। অপর দিকে মাদরাসার শিক্ষকদের জন্য মাত্র একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে যেটির অবস্থানও ঢাকার বাইরে গাজীপুরে। মাদরাসার প্রশাসনিক কাজের গতি ফেরাতে মাদরাসার প্রিন্সিপাল, সুপারিনটেন্ড এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সাধারণ প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার বিষয়েও তাগিদ অনুভব করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অপর দিকে কওমি শিক্ষা ধারায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে সরকারের কোনো তদারকি না থাকলেও কওমি মাদরাসা থেকে শিক্ষা লাভের পর শিক্ষার্থীদের দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত করার বিষয়ে সরকারের যথেষ্ট তদারকির সুযোগ রয়েছে। যদিও এই ধারার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে দারুল উলূম দেওবন্দের ধারায় প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষালাভের পর শিক্ষার্থীদের দীনের তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ তৈরি করা। তাই একটি পর্যায় পর্যন্ত দীনের উমুমি ও বুনিয়াদি বিষয়াদি সম্পন্ন করার পরে যেন শিক্ষার্থীরা কর্মমুখী শিক্ষায় যায়, তা নিশ্চিত করেই অগ্রসর হতে হবে। এজন্য প্রস্তাব হিসেবে ছানবী উলয়া বা শরহে বেকায়া স্তর পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে সম্মিলিত রাখার পরে মেধাবী ও পরিশ্রমী একটি অংশকে বাছাই করে দীনী বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রেখে অন্যদের জন্য কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থার সুযোগ সরকারের পক্ষ থেকেই করতে হবে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট আলেমে দীন মাওলানা লিয়াকত আলী মনে করেন, আল হাইয়াতুল উলয়া কর্তৃপক্ষ কওমি সনদের বর্তমান স্বীকৃতির প্রয়োগক্ষেত্র সম্প্রসারণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাথে আলোচনা ও যোগাযোগ করতে পরে। যেমন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুল ও আলিয়া মাদরাসার শিক্ষকতায় কওমি সনদের গ্রহণযোগ্যতা থাকলে এসব পদে কওমি পড়–য়ারা প্রতিযোগিতা করতে পারবেন। এতে কওমি মাদরাসা পড়–য়াদের বিচরণক্ষেত্র বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষা চর্চায় নিয়োজিত ও নিবেদিত দুইটি পক্ষের সম্মিলন ঘটবে। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে এই সংহতি প্রয়োজন ও ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করি। তার মতে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও কওমি পড়–য়া শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বৃদ্ধি ও স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।