যাদের ত্যাগে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ

কষ্টের দিনাতিপাত থেকে আখেরাতের জন্য তৈরি হাফেজ রেদওয়ান

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
back-4
কষ্টের দিনাতিপাত থেকে আখেরাতের জন্য তৈরি হাফেজ রেদওয়ান

চার ভাইয়ের মধ্যে হাফেজ রেদওয়ান আলী ছিলেন বাবা-মায়ের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। কারণ তার আচার-আচরণ ছিল অমায়িক। বাবা মাকে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। বছরখানেক আগে গোপালগঞ্জের মেয়ে রুকাইয়া খাতুনের সাথে রেদওয়ানের বিয়ে হয়। তাদের ঘর এখন ছয় মাস বয়সের বায়েজিদ বোস্তামী আলোকিত করে রেখেছেন। রেদওয়ানের ছোট দুই ভাই হেফজ খানায় পড়ালেখা করেন। মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী যখন শাহাদতবরণ করেন তখন হাফেজ রেদওয়ান স্বপ্ন আঁকেন তার সন্তান হলে সাঈদী সাহেবের মতো তৈরি করবেন। সন্তান হয়তো মানুষের মতো মানুষ হবে, আলেম হবে কিন্তু হাফেজ রেদওয়ান সেটা উপভোগ করতে পারবেন না। কারণ তাকে জালিম স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পোষা কিছু মানুষ নামের পশু দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিলেন।

হাফেজ রেদওয়ান সবসময় স্মরণীয় মৃত্যু কামনা করতেন। কীর্তিগাঁথা আল্লাহর রাহে জীবন উৎসর্গকারী এক শহীদ হাফেজ রেদওয়ান। ৫ আগস্ট ২০২৪ দেশ স্বাধীনের দাবিতে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন হাফেজ রেদওয়ান। সকাল থেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীর ছাত্র-জনতার সাথে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী গ্রুপের দফায় দফায় সংঘর্ষ হতে থাকে। সাধারণ ছাত্র-জনতা ন্যায্য দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন করে এলেও এদিন দুপুরে আন্দোলনের সফলতা আসে। সফলতা আসার পরেও সন্ধ্যার দিকে আজমপুর উত্তরায় ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে পুলিশ মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ করে। আন্দোলনরত জনতার মাঝেই একজন ছিলেন হাফেজ রেদওয়ান। তিনি সবসময় আন্দোলনের সামনের দিকে ছিলেন। তিনি ভাবছিলেন সারা দেশ যখন আমরা স্বাধীন করে ফেলেছি তখন এখানেও স্বাধীন করা সম্ভব। স্বৈরাচার গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা যখন পদত্যাগ করেছে তখন তার প্রশাসন সন্ত্রাসী পুলিশবাহিনী বেশিক্ষণ আমাদের সাথে লড়াই করতে পারবে না। তার চিন্তাভাবনা ঠিকই ছিল। কিন্তু হঠাৎ পুলিশের নিক্ষেপ করা ৪টি গুলি তার শরীরে বিদ্ধ হয়। তন্মধ্যে ১টি গুলি কাঁধে আটকে যায়। সাথে সাথে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে পরে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় পরের দিন রাত ৯টায় ইন্তেকাল করেন কুরআনের পাখি হাফেজ রেদওয়ান।

হাফেজ রেদওয়ান শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সব ঋতুতেই নামাজের শুরুতে মসজিদে যেতেন। নামাজের পর কুরআন তেলাওয়াত ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস। সর্বদা অশ্রুসিক্ত চোখ তার ভালো সততাকে নির্দেশ করে এবং তার সম্পূর্ণ লক্ষ্য ছিল সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি আনুগত্য। নিয়মিত রাতে উঠে নামাজ পড়তেন। নিয়মিত রোজা রাখতেন। গোপনে সাদকা করতেন। তিনি ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করতে আগ্রহী ছিলেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা আন্দোলন শুরু হওয়ার সাথে সাথে, হাফেজ রেদওয়ান তার পরিবারকে বিদায় জানালেন জিহাদের কাজে আহ্বানে সাড়া দিয়ে। তার আত্মা তাকে বলেছিল যে তার নাম শহীদদের মধ্যে থাকবে। তাই তিনি তার মায়ের কাছে ফিসফিস করে বললেন মা আমি শহীদ হতে পারি। তিনি তার মাকে ধৈর্য ধরতে বললেন এবং মিসেসকে সান্ত্বনা দিতে বলেছিলেন। তার স্ত্রী রেদওয়ানের মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন। স্বামীর প্রস্থানের বিরোধিতা করেছিলেন রুকাইয়া এবং রেদওয়ান স্পষ্ট করে বলেছিলেন, আমি নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করেছি।

এ কারণেই হাফেজ রেদওয়ানের বাবা সাইদুল ইসলাম বলেন ছেলের মৃত্যুতে তিনি মোটেও দুঃখিত না। বরং শহীদের বাবা হতে পেরে গর্বিত। অথচ উপার্জনের কোনো ব্যক্তি এই পরিবারে নেই। তাদের স্থায়ী কোনো সম্পত্তিও নেই। শহীদ রেদওয়ানের ছোট দুই ভাই লেখাপড়া করেন।