অবাধে মাদকদ্রব্য দেশে প্রবেশ করায় সমাজের মূল চালিকাশক্তি তরুণ সমাজের মধ্যে বাড়ছে মাদক সেবনের প্রবণতা। তাদের জীবনীশক্তি কমছে, লুপ্ত হচ্ছে কর্মস্পৃহা। জাতীয় পর্যায়ে কমে যাচ্ছে উৎপাদনশীলতা। মাদকের কারণে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা, ধ্বংস হচ্ছে অর্থনীতি। দেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার হচ্ছে বিপুল অর্থ। মাদকের বিষাক্ত ছোবলে তছনছ হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার। বেকার তরুণরা মাদকসেবনের টাকা জোগাড় করতে জড়িয়ে পড়ছে নানাবিধ অপরাধে। পরিণামে সমাজে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, এমনকি খুনের মতো জঘন্য অপরাধ সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও মাদক নিয়ন্ত্রণ বিভাগ নিয়মিত মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়; কিন্তু মাঠপর্যায়ে মাদকদ্রব্য বহন ও বণ্টনের কাজে জড়িত ব্যক্তি ছাড়া হোতাদের কেশাগ্রও কখনো স্পর্শ করতে পারে না তারা।

বিশেষজ্ঞ ও সমাজতাত্ত্বিকরা বছরের পর বছর ধরে বলে আসছেন, হোতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারলে মাদকের বিস্তার রোধ অসম্ভব। বাস্তবে হয়েছেও তাই। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের বিষাক্ত ছোবল। তবে অবস্থার পরিবর্তনের সামান্য আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

সহযোগী একটি দৈনিকের খবরে জানা যাচ্ছে, অবৈধ মাদক ব্যবসায়ের হোতা বা গডফাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। মাদক কারবারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়া ১১৬ গডফাদারের ১৮২ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোকের প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা (সিআইডি)। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৩৯টি মামলার অধীনে এ সম্পত্তি পর্যায়ক্রমে বাজেয়াপ্ত করা হবে। ইতোমধ্যে সিআইডি ২৪টি মামলার তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দিয়েছে, বাকি ১৫টি মামলার তদন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে। এ ছাড়াও সারা দেশে মাদক কারবারি এবং তাদের অবৈধ সম্পদ শনাক্তে আলাদা অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। আরো ৬৮টি পৃথক অনুসন্ধান চালিয়ে গডফাদারদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

খবরে বলা হয়েছে, এই ক্রোকের প্রক্রিয়া চলছে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে। এটাই আশাবাদের জায়গা। সাম্প্রতিক অতীতে আমরা দেখেছি, মাদকের গডফাদার হিসেবে জাতীয় সংসদের কোনো এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। মন্ত্রীর স্টিকার লাগানো গাড়ি থেকে মাদকদ্রব জব্দ করা হয়েছে। মাদকপাচারের আলোচিত রুট হিসেবে পরিচিত একটি জেলায় প্রভাবশালী মন্ত্রীর বারবার সফরের ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ফলে মাদককারবারে ক্ষমতাসীনদের মদদ আছে কি না এমন সংশয় সৃষ্টি হয়।

বর্তমান সরকারের সময় মাদকের গডফাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হলে তা দেশ ও জাতিকে আক্ষরিক অর্থে রক্ষা করবে। তবে মাদককারবারিদের নিষ্ক্রিয় করতে শুধু সম্পদ ক্রোক বা জব্দ করা যথেষ্ট নয়, এ জন্য হোতাদের গ্রেফতার করতে হবে। তাদের আইনের মুখোমুখি করতে হবে। এ জন্য বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

বড় মাদককারবারিদের অনেকে রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করেন, অনেকে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পান। তাই ব্যবস্থা নিতে গেলে রাজনৈতিক চাপ আসবে। রাজনৈতিক বা অন্য কোনো চাপে যাতে অভিযান ও আইনি ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।