চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে ১৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে জাহাজ ভাঙা শিল্প। ১৯৬০ সালে সাইক্লোনের সময় একটি গ্রিক জাহাজ উপকূলে আটকে যায়। দীর্ঘদিন চেষ্টা করে স্থানীয়রা জাহাজটি ভাঙতে সক্ষম হন। সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে এখানে বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জাহাজ ভাঙা কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ রূপ নিতে শুরু করে। এতে দেশের রড ও ইস্পাতের বড় উৎস হয়ে ওঠে এ শিল্প। জাহাজ থেকে পাওয়া জেনারেটর, আসবাবপত্র, ক্যাবল, ইলেকট্রনিক্স ও ইঞ্জিন পার্টস স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়ে বিশাল এক সেকেন্ড-হ্যান্ড অর্থনীতি তৈরি করেছে।

এ শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছেন হাজারো মানুষ। তাদের মধ্যে গত দুই দশকেই দুর্ঘটনায় ইয়ার্ডগুলোতে মারা গেছেন আড়াই শতাধিক শ্রমিক। স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ অথবা গুরুতর আহত হয়েছেন সহস্রাধিক। এসব দুর্ঘটনা হয় বিষাক্ত গ্যাসের বিস্ফোরণে, উঁচু থেকে পড়ে, লোহার পাতের চাপে পড়ায়। এ ছাড়া আছে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি। তাৎক্ষণিক দুর্ঘটনা ছাড়াও জাহাজে থাকা মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসে অনেক শ্রমিক ফুসফুসের ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

শুক্রবার সকালে একটি এলএনজিবাহী জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে নয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। জাহাজটি গ্যাসমুক্ত না করে কাটার কাজ শুরু করায় এমনটি হয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ও দেশের আইন মেনে যেকোনো বিপজ্জনক রাসায়নিক বা এলএনজিবাহী জাহাজ কাটার আগে ‘গ্যাস-ফ্রি সার্টিফিকেট’ বা গ্যাসমুক্তকরণ সনদ নেয়া বাধ্যতামূলক। অথচ এই ইয়ার্ডে এমন প্রটোকল মানা হয় না। দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটির ক্ষেত্রেও এটি মানা হয়নি বলে জানিয়েছে কুমিরা ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদফতর। তার ওপর ইয়ার্ডে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক কিংবা ন্যূনতম অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংস্থান ছিল না।

উপকূলে গড়ে ওঠা জাহাজ ভাঙা শিল্পের আড়ালে এভাবে চাপা পড়ে যাচ্ছে শ্রমিকদের জীবন। অথচ তাদের শ্রমে-ঘামে অর্থনীতির চাকা ঘোরে; কিন্তু তাদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃপণতা করে মালিকপক্ষ ও তদারকি সংস্থাগুলো।

ঘটনার পর মালিকপক্ষ বলছে, শুক্রবার কারখানা বন্ধ ছিল। শ্রমিকরা কিভাবে কাজে জড়ালেন, সেটি তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। কিন্তু এ দায় মালিকপক্ষের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। এর জন্য গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। এ সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে গ্রিন ইয়ার্ডের কমপ্লায়েন্সের বিষয়ে জোর দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। আমরা এ আশ্বাসকে স্বাগত জানাই। কিন্তু অতীতে এ ধরনের বহু ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আলোর মুখ দেখেনি। নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে, যা সাময়িক সহায়তা মাত্র; তবে অর্থ দিয়ে কখনো প্রাণের ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়।

আমরা মনে করি, সীতাকুণ্ডের প্রতিটি জাহাজ ভাঙা কারখানায় জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স অডিট করা আবশ্যক। গ্যাসমুক্তকরণ সনদ ও শতভাগ নিরাপত্তাসামগ্রী ছাড়া কোনো ইয়ার্ডে কাজ চালানো হলে সাথে সাথে অনুমোদন বাতিল করতে হবে। কেবল আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখতে নয়, শ্রমিকের নিরাপত্তা সুরক্ষায় গ্রিন ইয়ার্ড স্বীকৃতি বাধ্যতামূলক করা দরকার।