ফিরে দেখা ২০২৫
অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতায় দেশের ক্রিকেট
Printed Edition
জসিম উদ্দিন রানা
টি-২০তে বাংলাদেশ দারুণ পারফর্ম করে বছরজুড়েই ছিল আলোচনায়। অবশ্য সাদা জার্সিতেও বাংলাদেশের বছরটা বেশ ভালোই কেটেছে। পঞ্চাশ শতাংশ ম্যাচে জয়ের রেকর্ড গড়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ছয় ম্যাচের তিনটিতে জয়, চাট্টিখানি কথা নয়। তবুও প্রতিপক্ষ বিচারে খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হওয়ার অবকাশ নেই। ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল মিশ্র। বড় টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হলেও বছরের শেষের দিকে দ্বিপক্ষীয় সিরিজে টাইগাররা ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। তবে বছরটা যেন ছিল টি-২০র। এক কথায় টাইগার ক্রিকেটটা ছিল বাংলাদেশের জন্য অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা।
টেস্ট
ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পরাজয় দিয়ে শুরু হয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ২০২৫ সাল । সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে তিন উইকেটে হেরেছিল স্বাগতিকরা। এর পর অবশ্য চট্টগ্রামে ঠিকই জয় তুলে নেয় শান্ত ও তার দল। সাদমান ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজের সেঞ্চুরিতে রেকর্ড গড়া জয় ধরা দিয়েছিল। ইনিংস ও ১০৬ রানে জিতেছিল বাংলাদেশ। টাইগারদের টেস্ট ইতিহাসের দ্বিতীয় বড় জয়। এরপর তো শ্রীলঙ্কায় নাজমুল হোসেন শান্তর জোড়া সেঞ্চুরিতে প্রথম টেস্ট ড্র করে বাংলাদেশ। তার পর অবশ্য কলম্বোতে পরাজয়ই হয়েছিল সঙ্গী। কিন্তু ঘরের মাঠে বাংলাদেশ আর ভুল করেনি।
নবাগত আয়ারল্যান্ডকে ধবলধোলাই করেছে ঘরের মাঠে। সিলেটে ইনিংস ও ৪৭ রানের জয়, মিরপুরে ২১৭ রানের বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হয় বাংলাদেশ দল। এ বছরে ব্যক্তিগত অর্জনের খাতাটাও সমৃদ্ধ। সাদা পোশাকে বাংলাদেশের পক্ষে ২০২৫ সালে সেঞ্চুরি এসেছে ৯টি। যা গড়েছেন মোট ছয়জন ব্যাটার। এদের মধ্যে সর্বোচ্চ তিনটি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। একাধিক সেঞ্চুরি আছে মুশফিকুর রহিমের। সাদমান, মিরাজ ছাড়াও একটি করে সেঞ্চুরি করেন লিটন দাস ও মাহমুদুল হাসান জয়।
বাংলাদেশের পক্ষে ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ উইকেট শিকার করেছেন তাইজুল ইসলাম। বাঁ-হাতি এই স্পিনার উইকেট নিয়েছেন ৩৩টি। দু’টো ফাইফার পেয়েছেন তাইজুল। মিরাজ তিনটি ফাইফারসহ ২০টি উইকেট নিয়েছেন।
টি-২০
২০২৫ সালে বাংলাদেশ মোট ৩১টি টি-২০ ম্যাচ খেলেছে। জিতেছে ১৫টি, হেরেছে ১৪টি, এবং একটি ম্যাচ পরিত্যক্ত। এক বছরে ১৫ জয়, এটিই এখন বাংলাদেশের টি-তে নতুন রেকর্ড।
২০২৩ সালে টি-২০তে এক পঞ্জিকা বর্ষে ব্যাটাররা ১২২টি ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন। সেটিকে পিছনে ফেলে ২০২৫ সালে রেকর্ড ২০৬টি ছক্কা মেরেছেন। প্রভাব ফেলেছে ব্যাটারদের রান তোলার গতিতেও। ১২৫.৯৭ স্ট্রাইক রেটে রান তুলেছেন তাঁরা।
গত বছরের মে মাসে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-২০ ক্রিকেটে অভিষেক হয় তানজিদ হাসানের। পরের বছরেই টি-২০ ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের বেশ কয়েকটি রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন এই বাঁ হাতি ব্যাটসম্যান। বছরজুড়ে ওপেনিংয়ে তিনি ভরসা ছিলেন জাতীয় দলেরও। এক পঞ্জিকা বর্ষে সবচেয়ে বেশি ছক্কার রেকর্ডটা এত দিন ছিল জাকের আলীর। ২০২৪ সালে ২১টি ছক্কা মেরেছিলেন তিনি। অথচ এ বছর শেষে তিনি চলে গেছেন ৫ নম্বরে। এর আগে রয়েছেন লিটন দাস (২৩), সাইফ হাসান (২৯), পারভেজ হোসেন (৩৪)। তাদের তিনজনকেও ছাড়িয়ে গেছেন ওপেনার তানজিদ হাসান, এ বছর ২৭ ইনিংসে ৪১ ছক্কা হাঁকিয়ে জাকেরকে অনেক পিছনে ফেলেছেন। দুশ্চিন্তা বরাবরই ছিল মিডল অর্ডারে। বিশ্বকাপে এসব জায়গায় কে খেলবেন, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। বছরজুড়ে ঘুরেফিরে জাকের আলী-শামীম হোসেন-তৌহিদ হৃদয়-নুরুল হাসানদের চেষ্টা করা হয়েছে। মাঝেমধ্যে রান করলেও আস্থার জায়গা তৈরি হয়নি। বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হতে পারে মিডল অর্ডারের ব্যাটিং।
বাংলাদেশের জন্য এ বছর বাড়তি প্রাপ্তি লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন। ২৫ ম্যাচে ৮.২৫ স্ট্রাইক রেটে ৩৩ উইকেট নিয়েছেন। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাকি দুই স্পিনার নাসুম আহমেদ ও মেহেদী হাসানও বাংলাদেশকে ম্যাচ জিতিয়েছেন। পেস বোলিংয়ে বাংলাদেশের নেতৃত্বটা আছে মোস্তাফিজুর রহমানের কাছেই। এ বছর ৬.০৯ গড়ে ওভারপ্রতি রান দিয়ে ২৬ উইকেট নিয়েছেন। তাসকিন আহমেদ-শরীফুল ইসলাম-তানজিম হাসানদের পারফরম্যান্স নিয়েও আছে সন্তুষ্টি।
এ বছর বাংলাদেশ তুলেছে মোট ৪২২৯ রান (অতিরিক্ত বাদে) যার ২৯% এসেছে ছক্কা থেকে। চার হাঁকানোর সংখ্যাও রেকর্ড ২৯৮টি। তবে এত রেকর্ডের পরও বিশ্বরেকর্ডটি অধরা। বিশ্বে এক বছরে ৩২৬টি ছক্কা হাঁকানোর রেকর্ড বর্তমানে রয়েছে অস্ট্রিয়ার দখলে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে আছে পাকিস্তান। ৩৪ ম্যাচে তাদের ছক্কার সংখ্যা ২৩৫টি। বাংলাদেশের অবস্থান তালিকার চতুর্থ। তাদের ঠিক ওপরে রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
ওয়ানডে
২০২৫ সালে বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেট ছিল মিশ্র অভিজ্ঞতার, যেখানে তারা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ জিতেও র্যাঙ্কিংয়ে অবনতি দেখেছে, তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ঘরের মাঠে দারুণ পারফরম্যান্স করে নতন মোমেন্টাম পেয়েছে। বিশেষ করে স্পিনারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ও তানজিদ তামিমের মতো নতুনদের উত্থান ছিল উল্লেখযোগ্য, যদিও মিডল অর্ডারের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল।
জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কা সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশ হেরেছিল। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে পারভেজ হোসেন ইমন ও তানভির ইসলামের মতো নতুন মুখদের কল্যাণে ১৬ রানে জিতে সিরিজ ১-১ সমতা আনে। শেষ ওয়ানডেতে হারলেও, সিরিজটি ছিল নতুনদের আত্মবিশ্বাসের সূচনা। অক্টেবরে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বড় ব্যবধানে সিরিজ (২-০) হারায় বাংলাদেশ। মিরপুরের স্পিন-বান্ধব পিচে স্পিনাররা, বিশেষ করে রিশাদ হোসেন (১২ উইকেট), অসাধারণ পারফর্ম করেন। ওয়ানডে ইতিহাসে প্রথমবার পুরো ৫০ ওভার স্পিনারদের দিয়ে বল করানো হয়, যা ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। তানজিদ তামিম ২৭ ইনিংসে ৭৭৫ রান করে দলের হয়ে সর্বোচ্চ রান করেন। সিরিজ জয় সত্ত্বেও, বাংলাদেশ ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে ৯ নম্বর থেকে ১০ নম্বরে নেমে গিয়েছিল, যা ছিল হতাশার।
পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে গ্রুপ পর্বে ভারত (৬ উইকেটে হার) এবং নিউজিল্যান্ডের (৫ উইকেটে হার) কাছে টানা দুই ম্যাচে হেরে বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়। পাকিস্তানের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ১-২ ব্যবধানে হেরে যায় বাংলাদেশ।