হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ চট্টগ্রামবাসীর আইনগত, ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি
মতবিনিময় সভায় বক্তারা
Printed Edition
চট্টগ্রামকে ২০০৩ সালে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সর্ববৃহৎ বিভাগ, বৃহত্তম সমুদ্র বন্দরসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে সর্বোচ্চ অবদান চট্টগ্রামে হওয়ার পরেও চট্টগ্রামের বিচারপ্রার্থী জনগণ সর্বোচ্চ আইনের আশ্রয় লাভে সাংবিধানিক সমঅধিকার হতে বঞ্চিত হচ্ছে। হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ চট্টগ্রামবাসীর আইনগত, ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি। এ দাবি বাস্তবসম্মত, আবশ্যিক ও ন্যায়ত সঠিক, যথার্থ ও আইনসঙ্গত।
গতকাল শনিবার সকালে চট্টগ্রাম হাইকোর্ট বেঞ্চ বাস্তবায়ন পরিষদ ও চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের যৌথ উদ্যোগে মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
চট্টগ্রাম হাইকোর্ট বেঞ্চ বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট এ.এস.এম. বদরুল আনোয়ারের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাশেম কামাল ও চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সদস্যসচিব জাহিদুর রহমান কচি অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ও বাংলাদেশের বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর ও বাণিজ্য বাজার চট্টগ্রামে অবস্থিত। কিন্তু বন্দরসংশ্লিষ্ট এডমিরালটি আইনসংক্রান্তে ও কোম্পানি আইনসংক্রান্তে এখতিয়ার সম্বলিত হচ্ছে একমাত্র হাইকোর্ট। বিভিন্ন রাষ্ট্রের পর্যালোচনায় দেখা যায়, যেই রাষ্ট্রের মূলবন্দর যেই শহরে অবস্থিত সেই শহরের মধ্যেই এডমিরালটি ও কোম্পানি আইন এখতিয়ারসম্পন্ন সংশ্লিষ্ট আদালত বা হাইকোর্ট সার্কিট বেঞ্চ স্থাপিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ চীনের সাংহাই, দক্ষিণ কোরিয়ার কুসান, ভারতের মুম্বাই, নেদারল্যান্ডের রটাডাম, জার্মানির হামবুর্গ, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পোর্ট হার্ডলেড উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এডমিরালটি ও কোম্পানি আইন এখতিয়ার সম্বলিত সার্কিট হাইকোর্ট বেঞ্চ কিংবা আদালত চট্টগ্রামে স্থাপিত হওয়ার আবশ্যকতা থাকলেও তা সর্বদা উপেতি হয়েছে।
যে সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সার্কিট বেঞ্চ স্থাপিত হয় ও সফলতা পেয়েছে-পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতায় হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ থাকলেও আন্দামান, নিকোবর ও জলপাইগুড়িতে সার্কিট বেঞ্চ স্থাপিত হয়। দেশটিতে ২৪টি সার্কিট স্থায়ী বেঞ্চের সাথে ছয়টি সার্কিট বেঞ্চ স্থাপিত আছে। তার মধ্যে কয়েকটি সার্কিট বেঞ্চকে স্থায়ী বেঞ্চে পরিণত করা হয়।
পাকিস্তানে হাইকোর্টের পাঁচটি স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপিত হয়েছে। মূল বেঞ্চ ইসলামাবাদে, অপর চারটি বেঞ্চ লাহোর, করাচি, পেশোয়ার ও কুট্টাতে। লাহোর হাইকোর্টের তিনটি সার্কিট বেঞ্চ, করাচিতে হাইকোর্টের তিনটি বেঞ্চ, পেশোয়ারে চারটি বেঞ্চ এবং কুট্টাতে চারটি বেঞ্চ স্থাপিত হয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে এ.এস.এম. বদরুল আনোয়ার বলেন, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিভাগ, যার আয়তন ৩৩,৯০৪ বর্গকলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি। এ বিভাগে জেলা রয়েছে ১১টি, উপজেলা ১০৩টি, থানা ১২০টি, পৌরসভা ৬২টি, ইউনিয়ন পরিষদ ৯৪৯টি, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে অবস্থিত। কিন্তু চট্টগ্রামবাসীর নাগরিক ও মৌলিক অধিকারসহ আইনগত অধিকার নিশ্চিত করিতে দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা হাইকোর্ট বিভাগের সার্কিট বেঞ্চ এখনো পুনঃস্থাপন হয়নি। তিনি বলেন, চট্টগ্রামবাসী ও বিচার প্রার্থী জনগণের এখন প্রাণের দাবি চট্টগ্রামে হাইকোর্ট বেঞ্চ। চট্টগ্রামবাসীর এ প্রাণের যৌক্তিক দাবির সাথে চট্টগ্রাম হাইকোর্ট বেঞ্চ বাস্তবায়ন পরিষদ একাত্মতা ঘোষণা করছে। তিনি বলেন, হাইকোর্টের কেবল স্থায়ী বেঞ্চ ঢাকায় অবস্থিত হওয়ায় চট্টগ্রামের বিচার প্রার্থী জনগণ সঠিক ও যথাযথ ন্যায়বিচার হতে বঞ্চিত হয়। তার কারণ হলো অনাকাক্সিক্ষত অতিরিক্ত খরচ, প্রতারক (দালাল) দ্বারা লাখ লাখ টাকা হারানো, সারা দেশের মামলায় একমাত্র হাইকোর্ট ভারাক্রান্ত হওয়ায় মামলায় দীর্ঘসূত্রতা, সামান্য বিষয়ে বা ইস্যুতে মামলার জন্য আইনজীবী নিয়োগে অনাকাক্সিক্ষত খরচ প্রদান ও ন্যায়বিচার অনিশ্চয়তা।
মতবিনিময় সভায় বলা হয়, কেবল চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতিতে বর্তমানে প্রায় ছয় হাজার সদস্য, তন্মধ্যে প্রায় দুই হাজার হাইকোর্টে প্র্যাকটিসের অনুমতিপ্রাপ্ত। চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতিসহ এ বিভাগের অধীনে সংশ্লিষ্ট জেলার আইনজীবী সমিতিতে অনেক তরুণ মেধাবী যোগ্যতাসম্পন্ন আইনজীবী আছেন। হাইকোর্ট একটিমাত্র বেঞ্চ ঢাকায় স্থাপিত হওয়ায় সেই তরুণ মেধাবী আইনজীবীগণের মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে আর দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বারের সাবেক সভাপতি নাজিম উদ্দিন চৌধুরী ও সাবেক সভাপতি এনামুল হক অভিন্ন সুরে বলেন, বিচারবিভাগ সংস্কার কমিশন দেশের জনগণের সার্বিক কল্যানে চট্টগ্রামসহ সাবেক বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপনের প্রস্তাব করেছেন, যা যুগোপযোগী ও দেশের মানুষের জন্য সার্বিক কল্যাণকর।
মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) চট্টগ্রাম বুরো প্রধান মো: শাহনওয়াজ, মানবাধিকার নেতা অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান, চট্টগ্রাম বারের সাবেক সেক্রেটারি জিয়াউদ্দিন আহমেদ, অ্যাডভোকেট মোস্তফা আজগর শরিফী, অ্যাডভোকেট কাজী আশরাফুল হক আনসারি, অ্যাডভোকেট সাইফুল আবেদীন, অ্যাডভোকেট পুষ্পা সুলতানা, অ্যাডভোকেট এ.বি.এম. ওমর আলী ও চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সদসরা উপস্থিত ছিলেন।