গাজায় ৭৩ দিনে ইসরাইলি হামলায় নিহত ৪১১ ফিলিস্তিনি
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইসরাইলি বাহিনী গাজা উপত্যকায় অন্তত দুই ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। এর পাশাপাশি যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে মানবিক সহায়তা প্রবেশেও বাধা দিচ্ছে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, গতকাল গাজা শহরের পূর্বাঞ্চল শুজাইয়া এলাকায় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে দু’জন নিহত হয়েছেন। সোমবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ১২। এর মধ্যে আটজনের লাশ ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির শত শত লঙ্ঘনের সর্বশেষ উদাহরণ। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, ইসরাইল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ৮৭৫ বার লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্যে বিমান ও গোলাবর্ষণ, ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস এবং অন্তত ২৬৫ বার বেসামরিকদের ওপর গুলি চালানো অন্তর্ভুক্ত। অফিসের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৪১১ জন নিহত এবং এক হাজার ১১২ জন আহত হয়েছেন।
গাজা সরকারি জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি বাহিনী ৭৩ দিন ধরে ক্রমাগত এবং পরিকল্পিতভাবে তা লঙ্ঘন করে চলেছে। তাদের এই কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং চুক্তির মানবিক প্রটোকলকে চরমভাবে অবজ্ঞা করছে।
সোমবার এক বিবৃতিতে দফতর জানায়, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো ‘ইসরাইল’র পক্ষ থেকে মোট ৮৭৫টি লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে সামরিক নাগরিকদের ওপর সরাসরি গুলির ঘটনা ২৬৫টি, আবাসিক এলাকায় সামরিক যানের অনুপ্রবেশ ৪৯টি, ফিলিস্তিনি ও তাদের ঘরবাড়ি লক্ষ্য করে ৪২১টি গোলাবর্ষণ ও হামলার ঘটনা এবং বেসামরিক ভবন ও স্থাপনা ধ্বংস ও গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনা ১৫০টি। বিবৃতি অনুযায়ী, এসব যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনায় ৪১১ ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ১১২ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া ৪৫ জনকে বেআইনিভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদিকে মানবিক সহায়তার বিষয়ে জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, সহায়তা প্রবেশের ক্ষেত্রে ইসরাইল প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্ধারিত ৪৩ হাজার ৮০০টি ট্রাকের বদলে ওই সময়ে গাজায় মাত্র ১৭ হাজার ৮১৯টি সহায়তার ট্রাক প্রবেশ করতে পেরেছে, যা মোট প্রতিশ্রুতির মাত্র ৪১ শতাংশ। জ্বালানি সরবরাহেও মারাত্মক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। তফসিল অনুযায়ী তিন হাজার ৬৫০টি ট্রাক আসার কথা থাকলেও এসেছে মাত্র ৩৯৪টি, যা মাত্র ১০ শতাংশ। এর ফলে হাসপাতাল, বেকারি, পানি শোধনাগার এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
জনসংযোগ বিভাগ আরো সতর্ক করেছে, তাঁবু ও ভ্রাম্যমাণ ঘর (মোবাইল হোম) প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি থাকায় আশ্রয় সঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক শীতকালীন ঝড়ো হাওয়ায় এর আগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ৪৬টি ঘর ধসে পড়েছে এবং ভেতরে আশ্রয় নেয়া ১৫ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া, বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এক লাখ ২৫ হাজারের বেশি তাঁবু ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, যার ফলে প্রায় ১৫ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ কোনো প্রকার সুরক্ষা ছাড়াই মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বিশেষ করে সামনে যখন হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডার সময় তথা ‘চল্লিশ দিনের’ সময় ঘনিয়ে আসছে, তখন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, এই চলমান লঙ্ঘনগুলো যুদ্ধবিরতি চুক্তির সাথে এক বিপজ্জনক প্রতারণা। তারা ইসরাইলকে অবদমন, অনাহার এবং জবরদস্তির নীতি চাপিয়ে দেয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছে। একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বজায় রাখার কথা থাকলেও এই মানবিক বিপর্যয়ের সময় যে পরিমাণ প্রাণহানি এবং পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, তার জন্য ইসরাইলকেই সম্পূর্ণ দায়ী করা হয়েছে।
আশ্রয় সঙ্কট আরো ভয়াবহ : ইসরাইলের গণহত্যায় বাস্তুচ্যুত লাখো ফিলিস্তিনি পরিবার খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয়ের সঙ্কটে ভুগছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরাইলের দায়িত্ব ফিলিস্তিনিদের প্রয়োজন মেটানো। কিন্তু জাতিসঙ্ঘ ও মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, ইসরাইল নিয়মিত সহায়তা প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক শীতকালীন ঝড়ো পরিস্থিতি আরো খারাপ করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ইসরাইলের তাঁবু, কম্বল ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা ফিলিস্তিনিদের জীবনের জন্য হুমকি। গাজার মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ৪৩ হাজার ৮০০ ট্রাক প্রবেশের কথা থাকলেও মাত্র ১৭ হাজার ৮১৯ ট্রাক ঢুকেছে। প্রতিদিন গড়ে ২৪৪ ট্রাক প্রবেশ করেছে, যা চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত ৬০০ ট্রাকের চেয়ে অনেক কম। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টেফান দ্যুজারিক বলেছেন, ‘যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গত ২৪ ঘণ্টায় গাজায় বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও গুলির খবর পাওয়া গেছে। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটছে এবং মানবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।’ তিনি জানান, জাতিসঙ্ঘের অংশীদাররা প্রায় ১৩ লাখ মানুষের জন্য আশ্রয় নিশ্চিত করতে কাজ করছে। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় তিন হাজার ৫০০ পরিবার বন্যাপ্রবণ এলাকায় বসবাস করছে। সহায়তার মধ্যে তাঁবু, বিছানার সরঞ্জাম, কম্বল ও শিশুদের জন্য শীতের পোশাক রয়েছে। তবে চাহিদা এখনো বিপুল।
স্বাস্থ্যসেবায় সঙ্কট : গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে রোগীদের সেবা দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রায় সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত ১২৫টি স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, যার মধ্যে ৩৪টি হাসপাতাল রয়েছে। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, অক্টোবর ২০২৩ থেকে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৭০ হাজার ৯৩৭ জন নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশ নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজার ১৯২ জন।
গাজায় সেনা মোতায়েনের অনুরোধ পেয়েছে ইতালি
গাজা ও ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন বা অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়ায় সহায়তার জন্য ইতালির কাছে সেনা পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। জিবুতিতে একটি সামরিক সহায়তা ঘাঁটিতে এবং ‘আন্তোনিও মার্সেলিয়া’ ফ্রিগেটে অবস্থানরত ইতালীয় সেনাদের সাথে বড়দিন উদযাপনের সময় তাজানি এ মন্তব্য করেন। সেনাদের উদ্দেশে তাজানি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে কর্মরত আপনাদের অন্য সহকর্মীদের মতো আপনারাও শান্তির বাহক।’ তিনি আরো বলেন, ‘সব জায়গায় ইতালীয় সেনাদের প্রয়োজন রয়েছে। গাজা ও ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন বা যেকোনো অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়ের জন্য আমাদের উপস্থিতি চাওয়া হয়েছে। সার্বিয়া, কসোভো, আলবেনিয়া ও মন্টিনিগ্রোতে আমাদের বাহিনী যেমন স্বীকৃতি পেয়েছে, এটিও ঠিক তেমনই।’ ইতালীয় বাহিনীর বহুমুখী কর্মক্ষমতা ও বিভিন্ন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেয়ার সক্ষমতার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। এ ছাড়া লোহিত সাগরে ইতালির কৌশলগত অর্থনৈতিক স্বার্থের কথাও তুলে ধরেন তাজানি। দেশটির সমুদ্রবাণিজ্যের ৪০ শতাংশই এই পথ দিয়ে হয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘অ্যাসপাইডস’ মিশনেও ইতালীয় সেনারা বর্তমানে অবদান রাখছেন। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সুদানের অস্থিরতার ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেন ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, সেখানকার পরিস্থিতির কারণে ইতালির দিকে অনিয়মিত অভিবাসনের স্রোত তৈরি হতে পারে।
২০২৭ পর্যন্ত বিদেশী গণমাধ্যমে বিধিনিষেধ বাড়াল নেসেট
ইসরাইলি নেসেট বিদেশী গণমাধ্যম বন্ধ করার ক্ষমতাসম্পন্ন আইনটির মেয়াদ বাড়িয়েছে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে গণমাধ্যম বন্ধ করার এই আইন এখন ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। গত সোমবার রাতে কনেসেটের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পাঠে বিলটি পাস হয় বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটর। লিকুদ দলের এমপি এরিয়েল কালনার প্রস্তাবিত বিলটি ২২ ভোটে পাস হয়, বিপক্ষে ভোট পড়ে ১০টি। আইন অনুযায়ী, ইসরাইলি যোগাযোগ মন্ত্রণালয় বিদেশী গণমাধ্যমের কার্যক্রম সীমিত করার ব্যাপক ক্ষমতা পাবে। যোগাযোগমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী ও নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা বা সরকারের অনুমোদন নিয়ে কোনো বিদেশী চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করতে পারবেন, যদি তিনি মনে করেন এর বিষয়বস্তু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। এই আইনের আওতায় সম্প্রচার স্থগিত, কার্যালয় বন্ধ, সরঞ্জাম জব্দ, ওয়েবসাইট বন্ধ এবং স্যাটেলাইট সম্প্রচার নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেয়া যাবে। প্রশাসনিক আদেশের মেয়াদ হবে ৯০ দিন, তবে তা বাড়ানো সম্ভব। মানবাধিকার ও গণমাধ্যম সংগঠনগুলো আগে থেকেই এ আইন নিয়ে সমালোচনা করেছে। তাদের আশঙ্কা, এই আইন ব্যবহার করে আরব ও বিদেশী গণমাধ্যমের ওপর আরো বেশি বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে।
গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার হবে না
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বলেছেন, ইসরাইল কখনোই গাজা উপত্যকা থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাবে না। তিনি উত্তর গাজায় নতুন সামরিক-কৃষি ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংবাদমাধ্যম আলারাবিয়া। কাটজ এই বক্তব্য দেন ইসরাইলি সেনার বিনিয়ামিন ব্রিগেডের সদর দফতর স্থানান্তর এবং পশ্চিম তীরের দখলকৃত বেইত এল এলাকায় এক হাজার ২০০ নতুন বসতি নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে। জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অধিকাংশ দেশ পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ বলে মনে করে। কাটজ বলেন, ‘আমরা সঠিক সময়ে সঠিকভাবে এটি করব। কেউ কেউ প্রতিবাদ করে; কিন্তু নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে।’ বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সরকার বসতির সরকার। এটি সম্পৃক্ততা চায়। যদি সার্বভৌমত্ব সম্ভব হয়, আমরা তা প্রয়োগ করব। আমরা এখন বাস্তব সার্বভৌমত্বের সময়ে আছি। ৭ অক্টোবরের ভয়াবহ ঘটনার পর ইসরাইল যে শক্তি ও অবস্থান দেখিয়েছে, তাতে বহুদিন পর নতুন সুযোগ এসেছে।’