নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে শিপচরের সবুজের অস্তিত্ব
যখন আমরা শিপচরের কাছে পৌঁছালাম তখন বছরখানেক আগে পাওয়া তথ্যের সাথে কোনো মিলই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কোথায় সেই বড় বড় সবুজ ঘাস? কোথায় সেই উপকূলীয় গাছ? কিছুই তো নেই!
Printed Edition
রফিকুল হায়দার ফরহাদ শিপচর (পটুয়াখালী) থেকে ফিরে
দুই দফা জেলেদের কাছে জেনেছিলাম বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা শিপচর সম্পর্কে। চর কুকরিমুকরির মাঝি জাকির লস্কর কিছু পর্যটক নিয়ে রাত্রি যাপন করেন এ শিপচরে। তখন সে জাকির মাঝি যে ছবি পাঠিয়েছিলেন তাতে ছিল চর বা দ্বীপটিতে সবুজ বনের উপস্থিতি। বন বলতে লম্বা লম্বা ঘাস এবং কিছু উপকূলীয় বনের গাছ গাছালি। একটি চরে বা দ্বীপে গাছপালার উপস্থিতি মানেই পরিপূর্ণ জীববৈচিত্র্য।
জেলেরা জানিয়েছেন, এ গাছপালা ছিল সামুদ্রিক পাখি এবং অতিথি পাখিদের আশ্রয়স্থল ও বাসা বানানো তথা ডিম পাড়ার ক্ষেত্র। সাগরের মাঝে জেগে ওঠা দ্বীপ মানেই নতুন পর্যটক স্পট। ভ্রমণপিপাসু বিশেষ করে যারা প্রত্যন্ত দ্বীপ/চর বা বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান তাদের বেড়াতে যাওয়ার আদর্শ স্থান। গত চার বছরে কয়েক দফা চেষ্টা করেও শিপচরে আর যাওয়া হয়নি। কখনো টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায়। কখনো সঙ্গীর অভাবে। কারণ একা একা এমন একটি দ্বীপে শুধু মাঝিকে বিশ্বাস করে যাওয়াটা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত এবার দৈনিক নয়া দিগন্তের পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর প্রতিনিধি রফিকুল ইসলামকে সঙ্গী করে রওয়ানা দিলাম সাগরের বুকে ভেসে ভাসা এ শিপচরের উদ্দেশে। আর ট্রলারের মাঝি রফিকুল ইসলামেরই ভাই শহীদুল হাওলাদার হওয়ায় বিশ্বাস। ভরসার জায়গাটা আরো পোক্ত হলো। কারণ সাগরের জেলে/মাঝিরাই সুযোগ বুঝে জলদস্যু হয়ে যায়। অন্যের ট্রলারে লুটপাট, সে ট্রলারের মাঝি, জেলেদের খুন-খারাবি করাটা তাদের কাছে আর বিষয়ও থাকে না। তবে শিপচরে পৌঁছে হতাশই হতে হলো। কারণ গাছপালা- ঝোপজঙ্গলের কোনো অস্তিত্বই নেই। অবশ্য শত শত পাখিকে দেখা গেল দ্বীপের পশ্চিম পার্র্শ্বে।
শহীদুল হাওলাদার অবশ্য মাছ ধরতে যাওয়া ট্রলারের মাঝি নন, তিনি ক্যারি বোট চালান। নিজের এ বোট নিয়ে উপকূলীয় এলাকায় জেলেদের কাছ থেকে মাছ কেনেন। এরপর ভালো লাভে ঘাটে বিক্রি করেন। শহীদুল হাওলাদার আগে কখনই শিপচর যাননি। আমাদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই রাজি হলেন যেতে। যেহেতু তার কাছে অপরিচিত এ শিপচর তাই সাগরের বুকে অন্য মাঝিদের জিজ্ঞাসা করে করে তিনি ছুটলেন। সাথে ছিল গুগল ম্যাপের সহায়তা।
ঢাকার সদরঘাট থেকে সন্ধ্যায় পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর চর মোন্তাজের লঞ্চে ওঠে সকাল ৯টায় পৌঁছালাম। সেখান থেকে ট্রলারে করে দুই ঘণ্টা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছালাম শিপচরে। এ চরের অবস্থান মিনি সুন্দরবন খ্যাত সোনার চরের দক্ষিণ পূর্বে এবং ভোলার চর ফ্যাসনের আরেক মিনি সুন্দরবন খ্যাত চর কুকরিমুকরির দক্ষিণ পশ্চিমে। কুকরিমুকরি থেকে অবশ্য যেতে একটু বেশি সময় লাগে- এ তথ্য দিয়েছেন জাকির লস্কর।
আমরা চর মোন্তাজঘাট থেকে ট্রলারে করে আন্ডার চর আর সোনার চরের মাঝ দিয়ে রওনা হলাম। তবে সমস্যা হচ্ছিল ঘন কুয়াশার কারণে। মাঝি শহীদুলের পক্ষে খালি চোখে শনাক্ত করা সম্ভবই হচ্ছিল না শিপচরের অবস্থান। একেতো উনি আগে কখনই আগে শিপচরে যাননি, তার ওপর কুয়াশা। দুপুর বারোটার সময়ও সাগরে কুয়াশা। সে সাথে সাগরের নানান জায়গায় থাকা ডুবোচর বারবার সতর্ক থাকতে বাধ্য করেছিল শহীদুল মাঝিকে। ওই সময়ে সাগরে মাছ ধরা জেলে নৌকার সংখ্যা একেবারেই কম ছিল। কয়েক কিলোমিটার পরপর দুই-একটা জেলে নৌকা দেখা যেত। সে নৌকার মাঝির নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা বলতে থাকি। সাথে আমরা দূরে চলে যাওয়ার পর সে নৌকা/ ট্রলারকে দেখা যাচ্ছে কি না সেটাও বারবার পর্যবেক্ষণ করা হতো। কারণ ভাটার কারণে ডুবোচর এড়াতে গিয়ে বারবারই দিক পাল্টে যাচ্ছিল।
এরই মাঝে দুুপুরে খাওয়ার জন্য ৫০ টাকা দিয়ে চারটি তপসী মাছ (কেউ বলে রিসসা মাছ, কেউ ডাকে রামচুস মাছ) এবং ১২টি ছোট সাইজের পোয়া মাছ কিনলাম। ৭-৮ বছরের দুই ছেলেকে নিয়ে সাগরে মাছ ধরছিল দুই জেলে। আগে থেকেই সাথে করে খাবার পানি, চাল, ডাল, তেল, মরিচ নিয়ে রেখেছিলাম। আর প্রতিটি ট্রলারেই চুলা এবং হাড়ি-পাতিল থাকে। কারণ সাগরে যাওয়া জেলেরা সেখানে ৬-৭ দিন থাকেন। আমরা মোট তিনটি নৌকার মাঝির কাছে জিজ্ঞাসা করেছিলাম শিপচরের অবস্থান জানান জন্য। এর মধ্যে এক ট্রলারের কাছে আমরা যাচ্ছিলাম শিপচর সম্পর্কে তথ্য জানান জন্য। কিন্তু মাঝিমাল্লারা আমাদের সরকারি লোক ভেবে দ্রুতই ট্রলার চালিয়ে চলে যেতে লাগলো। পরে চিৎকার দিয়ে তাদের বললাম, আমরা শিপচরের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাই। এরপর ট্রলারের গতি থামিয়ে তারা কথা বলেন। শেষ পর্যন্ত তার দেয়া তথ্য মতোই আমরা শিপচরের সন্ধান পাই। এতে দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়ে সাগরের বুকে। শীতকালে সাগর অনেক শান্ত। ঠিক পুকুরের মতো শান্ত থাকে। তাই সমস্যা হয়নি ঘুরে ঘুরে শিপচর সম্পর্কে তথ্য নেয়ার পর্ব শেষ করতে।
তবে যখন আমরা শিপচরের কাছে পৌঁছালাম তখন বছরখানেক আগে পাওয়া তথ্যের সাথে কোনো মিলই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কোথায় সেই বড় বড় সবুজ ঘাস? কোথায় সেই উপকূলীয় গাছ? কিছুই তো নেই! ট্রলার থেকে লাফিয়ে হাঁটুপানিতে নেমে এরপর গেলাম মূল চরে। কিছুটা এগোতেই মোটা একটি হাঁড় পড়ে থাকতে দেখলাম বালুর উপরে। মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর হাঁড় হতে পারে। আমরা দ্বীপের পশ্চিম দিক থেকে হেঁটে পূর্ব দিকে যেতে সাগর পাড়ে ছোট ছোট কিছু স্তূপ দেখলাম। মনে হচ্ছিল গরু বা মহিষের গোবর। খুব কাছে গিয়ে বুঝলাম এগুলো মাটির স্তূপ। এখানে যে এক সময় ঘাস ছিল, গাছপালা ছিল সেটারই প্রমাণ দিচ্ছিল এ মাটির স্তূপ। আরেকটু সামনে পাওয়া গেল অসংখ্য মরা ঘাসের গোড়া। সেখানে সাদা সাদা ঝিনুক লেগে আছে।
জেলেদের মতে, নানা কারণেই এ ঘাস মরে যায়। হয়তো লবণাক্ততা বেশি বা বালির অতিরিক্ত উপস্থিতি। তা ছাড়া বেশি সময় এ দ্বীপ পানির নিচে ডুবে থাকলে ঘাস মরে যায়। সাগড় পাড়ে নাকি এটাই নিয়ম। ভাটার কারণে আমরা কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ এ দ্বীপটি দেখার সুযোগ পেয়েছি।
আমরা একজন মানুষের ঠিক একটু আগেই হেঁটে যাওয়ার পায়ের ছাপ পেয়েছি। আমরা যখন দ্বীপে পৌঁছাই তখন দক্ষিণ দিকে কিছু বড় বড় পাখি দেখেছিলাম। আমরা কাছে যেতেই উড়ে চলে যায়। আশ্রয় নেয় পশ্চিম দিকে। এ দ্বীপে লাল কাঁকড়া থাকার কথা শুনলেও আমাদের চোখে পড়েনি। হয়তো দ্বীপের অন্য প্রান্তে আছে। এরপর ট্রলারের দিকে ফিরে আসার সময় পেলাম একটি মরা পটকা মাছ। পচে ফুলে পড়ে আছে বালির ওপর। আর সিগালসহ অন্য পাখিদের হাজার হাজার পায়ের ছাপ হালকা ভেজা বালির ওপর। শিপচরে আমরা শুকনো বালি কমই পেয়েছি। অধিকাংশ বালিই ভেজা ভেজা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দ্বীপটির উচ্চতাও কম মনে হয়েছে। অন্তত গত বছর পাওয়া ভিডিও চিত্রের তুলনায়। যে ভিডিও পাঠিয়েছিলেন জাকির লস্কর।
জেলেদের দেয়া তথ্য মতে, এক সময় একটি জাহাজ ডুবে গিয়েছিল এখানে। সে জাহাজের মাস্তুল বালির ওপর ভেসে আছে। জাহাজকে ইংরেজিকে শিপ বলে। তাই এ দ্বীপের নাম শিপচর। চর মোন্তাজের মাঝি আবদুর রশীদ জানান, তিনি ৩-৪ বছর আগ থেকেই শিপচরে পর্যটকদের নিয়ে যান। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে দক্ষিণে অবস্থিত চর বিজয় বা ভিক্টরি আইল্যান্ড। কুয়াকাটা বিচ থেকে নিয়মিত ¯িপড বোট ও ট্রলারে পর্যটকদের নেয়া হয় চর বিজয়ে। ব্যানার লাগিয়ে, মাইকিং করে পর্যটক টানা হয়। তবে সে রকম কোনো ব্যবস্থা নেই শিপচরের জন্য। পর্যটকরা চর মোন্তাজ বা চর কুকরিমুকরিতে গেলে তখন মাঝিরাই কিছু পয়সা আয়ের আশায় পর্যটকদের শিপচরে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। এ ভাবেই ভ্রমণপিপাসুদের যাওয়ার সুযোগ হচ্ছে শিপচরে। সোনার চর এবং চর হেয়ার ঘুরে আসা দুই পর্যটক আশিক ও রাব্বী আমাদের কাছে শিপচর ভ্রমণের কথা শুনে আফসোসে পুড়লেন। কারণ তাদের জানা ছিল না এ আরেক পর্যটন ভেন্যু সম্পর্কে। তাই তাদের দাবি, সরকার এবং পর্যটন করপোরেশন যেন ভ্রমণপিপাসুদের শিপচর ঘুরার উদ্যোগ নেয়।
শিপচরে যেতে হলে পর্যটকদের পর্যাপ্ত, খাবার এবং পানি নিয়ে যেতে হবে। সেখানে কিন্তু কিছুই নেই। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে খোলা বালির ওপরই বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ সারতে হবে।