হাকালুকির জলমহালে কোটি টাকার মাছ লুট খাসের আড়ালে প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য

আবদুল কাদের তাপাদার, সিলেট ব্যুরো
Printed Edition
bangla 1
হাকালুকির জলমহালে কোটি টাকার মাছ লুট খাসের আড়ালে প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্য

মৌলভীবাজার ও সিলেটের পাঁচ উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত দেশের বৃহত্তম হাকালুকি হাওরের সবচেয়ে বড় সরকারি জলমহাল ‘হাওরখালে’ চলছে প্রকাশ্যে মাছ লুট। খাস কালেকশনের আড়ালে গত ১৭ দিনে অন্তত দুই কোটি টাকার মাছ তুলে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। জলমহাল দখল ও মাছ লুটপাটকে কেন্দ্র করে গত মঙ্গলবার বিলপাড়ে ত্রিমুখী ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এতে বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কায় পুরো এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় দুই হাজার একর এলাকার গোটাউরা হাওরখাল গ্রুপ (বদ্দ) জলমহালটি ১৪৩১ বাংলা সনের ৩০ চৈত্র পর্যন্ত তিন বছরের জন্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকায় ইজারা নেয় একটি মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। পরের তিন বছরের জন্য প্রায় ছয় কোটি টাকায় আরেকটি সমবায় সমিতি লিজ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ছিল। ঠিক এই সময় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। একটি প্রভাবশালী মহল সোনার বাংলা মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তান মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে দিয়ে ১৪৩২-৩৪ বাংলা সনের ইজারার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট (১৫৬৬৪/২০২৪) দায়ের করায় আদালত লিজ স্থগিত করে দেন।

অভিযোগ রয়েছে, পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে আছেন বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতা। লিজ স্থগিত হওয়ার পর জলমহালটি খাস কালেকশনে ন্যস্ত হলেও, সেই সুযোগে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের একটি চক্র তহশিলদার ও এসি ল্যান্ড অফিসকে ‘ম্যানেজ’ করে বিলে অস্থায়ী ঘাট তৈরি করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মাছ তুলছে। সরকারি কোষাগারে নামমাত্র রাজস্ব জমা দিয়ে বাকি অংশ বিলে বসেই মাছ বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

সূত্র দাবি করছে, গত ১৭ দিনে অন্তত দুই কোটি টাকার মাছ বিক্রি হলেও সরকারের রাজস্ব জমা হয়েছে মাত্র ১৫-১৬ লাখ টাকা। গত মঙ্গলবারের মাছ লুটের প্রতিবাদে কয়েক শ’ মানুষ বিলপাড়ে জড়ো হলে সেখানে ত্রিমুখী ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

বড়লেখা পৌর বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম খোকন বলেন, মাছ লুটের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি তহশিলদার নেই, পরিচিত কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা মাছ তুলতে ও মাছ বিক্রির তদারকি করছেন। সেখানে আমি ৩৫টি নৌকা প্রায় ১০ লাখ টাকার মাছ বিক্রির অপেক্ষায় থাকতে দেখেছি।

স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্থানীয় কয়েকজন নেতৃবৃন্দের মাধ্যমে সরকারি জলমহাল এমনভাবে লুট হতে পারে না। ১৭ দিনে অন্তত দুই কোটি টাকার মাছ লুট হয়ে গেল। প্রশাসন কি তবে এদের কাছে জিম্মি ?

এই ১৭ দিনে খাস কালেকশনে কত টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে, তা জানতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাঈমা নাদিয়া ও খাস কালেকশনের দায়িত্বে থাকা হাকালুকি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার ইউসুফ জাবেরের সাথে বারবার যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তারা কেউই ফোন রিসিভ না করায় তাদের বক্তব্য নেয়া যায়নি।

ইউএনও গালিব চৌধুরী বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসক স্যারের নজরে এসেছে। তার নির্দেশনায় এসি ল্যান্ডকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

এদিকে বিলপাড়ে উত্তেজনা বিরাজ করায় স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, জলমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যেকোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষ ঘটে যেতে পারে।