সালমান রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের ৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ

Printed Edition

জিলানী মিলটন

বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট সাত হাজার কোটি টাকার বেশি স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আগস্ট মাসে বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ এবং হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।

দুদক ও আদালত সূত্র জানায়, ক্রোক বা ফ্রিজ হওয়া সম্পদ আদালতের নির্দেশনায় বর্তমানে দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের আওতায় রয়েছে। দুদকের নেতৃত্বাধীন জাতীয় টাস্কফোর্সের অধীনে এখন পর্যন্ত মোট ২৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে দুদক ১১টি এবং সিআইডি ১৭টি মামলা করেছে। এসব মামলার বিপরীতে আদালতের নির্দেশনায় সম্পদগুলো ফ্রিজ রাখা হয়েছে।

জাতীয় টাস্কফোর্সের অধীনে যৌথ টিমের দায়ের করা মামলার বিপরীতে আদালতের আদেশে ফ্রিজ হওয়া সম্পদের মধ্যে রয়েছে- ১০৭টি বিও অ্যাকাউন্টে ৬৭.৫৫ বিলিয়ন বা ছয় হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা। ৯৪টি কোম্পানির শতভাগ শেয়ার। এ ছাড়া ১৯৭০.৪৬৭ শতাংশ জমি (আনুমানিক মূল্য ১১.৯৩ কোটি টাকা) এবং লন্ডনে দু’টি ফ্ল্যাট (আনুমানিক মূল্য ৭.৭৫ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড বা প্রায় ১২৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা)।

দুদকের উপ-পরিচালক মো: জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি জাতীয় টাস্কফোর্স বেক্সিমকো গ্রুপের দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। দুদক এখন পর্যন্ত ১১টি মামলা দায়ের করেছে এবং আরো প্রায় এক ডজন মামলার প্রস্তুতি চলছে। এসব মামলায় বিদেশে অর্থপাচারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। সালমান এফ রহমানের ছেলের নামে লন্ডনে দু’টি ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়ায় পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে দুদক দু’টি এমএলএআর (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট) পাঠিয়েছে।

রফতানি দেখিয়ে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে এলসির বিপরীতে ঋণের এক হাজার ৯৩৯ কোটি ৭৫ লাখ ৯২ হাজার টাকার আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে সালমান এফ রহমান, তার ভাই, দুই ছেলে এবং জনতা ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর পৃথক পাঁচটি মামলা দায়ের করে দুদক।

মামলাগুলোতে জনতা ব্যাংকের লোকাল অফিস থেকে আত্মসাৎ করা অর্থের মধ্যে রয়েছে পিয়ারলেস গার্মেন্ট লিমিটেড দেখিয়ে পাঁচ কোটি দুই লাখ ৫০ হাজার ৭৭২.২৫ মার্কিন ডলার, প্লাটিনাম গার্মেন্ট লিমিটেডের নামে এক কোটি ৮৮ লাখ তিন হাজার ৬৫৮.৯১ ডলার, কাঁচপুর অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে আট কোটি ৪০ লাখ ২৯ হাজার ৫৪৭.৪৫ ডলার, স্কাইনেট অ্যাপারেলস লিমিটেডের নামে এক কোটি ৪৭ লাখ ২৯ হাজার ৩৪০ ডলার এবং ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নামে চার কোটি ৭৭ লাখ ১৫ হাজার ৪৮২.৪৬ ডলার। সবমিলিয়ে মোট ২১ কোটি ৫৫ লাখ ২৮ হাজার ৮০১. ডলার বা এক হাজার ৯৩৯ কোটি ৭৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।

অপর দিকে ২০২৫ সালের ৩ জুন অপ্রতুল জামানত ও জাল সাব-কন্ট্রাক্ট চুক্তি দেখিয়ে অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে ঋণ দেখিয়ে প্রায় এক হাজার ১৭৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সালমান ফজলুর রহমান, তার ছেলে ও আইএফআইসি ব্যাংকের এমডিসহ ৩৯ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুই মামলা করে দুদক।

যার মধ্যে প্রথম মামলায় আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি থেকে প্রায় ৬৭৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২২ জন এবং ৪৯৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দ্বিতীয় মামলায় ১৭ জনকে আসামি করা হয়।

প্রথম মামলায় আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসিতে প্রায় ৬১৮ কোটি টাকা জালিয়াতি, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। কোনো সহায়ক জামানত বা সঠিক মূল্যায়ন ছাড়াই ২০২৪ সালের ২০ মার্চ এবং ১২ জুন পরিচালনা পর্ষদের দু’টি সভায় মোট ৬১৮ কোটি ৯ লাখ ৩১ হাজার ৭৫ টাকা ৮৫ পয়সা বিতরণের অনুমোদন দেয়া হয়। পরে তা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়, যা সুদ-আসলে দাঁড়ায় ৬৭৭ কোটি ৭৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা।

অন্য দিকে দ্বিতীয় মামলায় ৪৯৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ৪৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আসল, বাকিটা সুদ। এ মামলায় মোট ১৭ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।

এ দিকে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি ১৩৬ কোটি ৬৭ লাখ ৫৮ হাজার ৯৩১ টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে সালমান এফ রহমানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। মামলায় তার ভাই এ এস এফ রহমান, ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান ও আহমেদ শাহরিয়ার রহমানকেও করা আসামি হয়।

অপর দিকে জাল জামানত ও অতিমূল্যায়িত সম্পত্তির মাধ্যমে বন্ডের বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের ৮০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে সালমান এফ রহমান এবং বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলামসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল মামলা দায়ের করে দুদক।