ইয়ামি গৌতমের ‘হক’
মুসলিম নারীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম
Printed Edition
সাকিবুল হাসান
শাজিয়া বানো (ইয়ামি গৌতম) এবং আব্বাস খানের গল্প শুরু হয় ১৯৬৭ সালে উত্তর প্রদেশে, যেখানে তারা একে অপরের প্রেমে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। বানো তার স্বামীর ঘরকে একটি সুখী নীড়ে পরিণত করে অত্যন্ত তৃপ্তির সাথে দিন কাটাচ্ছিলেন। একজন ইমামের কন্যা হওয়ায় তিনি খুব বেশি শিক্ষিত ছিলেন না, তবে পবিত্র কুরআনের বাণী তিনি অন্তরে ধারণ করতেন। অন্যদিকে, আব্বাস ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন সুপ্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। তাদের কোলজুড়ে আসে প্রথম সন্তান কামরান এবং এরপর কন্যাসন্তান কানিজ। বছরের পর বছর কেটে যায়, সন্তানদের দায়িত্ব আর সাংসারিক চাপে বানোর ভালোবাসার সংসার আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সব কষ্ট সত্ত্বেও বানো হাসিমুখে তা মেনে নেন এবং আব্বাসের সাথে তাদের তৃতীয় সন্তানকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু একদিন হঠাৎ আব্বাস তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ গুছিয়ে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হন এবং বানোকে জানান, পৈতৃক সম্পত্তি সংক্রান্ত একটি বিবাদের কারণে তাকে জরুরি ভিত্তিতে যেতে হচ্ছে। এক মাস পর আব্বাস যখন ফিরে আসেন, তখন তার সাথে কোনো উপহার নয়; বরং দ্বিতীয় স্ত্রী সায়রা (বর্তিকা সিং) ছিলেন। বানোর চোখের সামনে তার সাজানো পৃথিবীটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আব্বাস কেন সায়রাকে বিয়ে করেছেন সে সম্পর্কে সবাই বানোর কাছে মিথ্যা বলে এবং তাকে চুপ থাকতে বাধ্য করা হয়। তবে বানো যখন নতুন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন সায়রা প্রকাশ করেন, আব্বাস সবসময়ই তাকে ভালোবাসতেন এবং সায়রার স্বামীর মৃত্যুর খবর পাওয়া মাত্রই তাকে বিয়ে করতে পাকিস্তানে ছুটে গিয়েছিলেন। বানো ধীরে ধীরে দেখতে পান কীভাবে তার এক সময়ের সুখের সংসার অন্ধকার ও শীতল হয়ে যাচ্ছে। তিনি নিজের বিছানায় একা হয়ে পড়েন এবং নিজ সংসারেই একজন দর্শক হিসেবে জীবন কাটাতে থাকেন। অত্যন্ত কষ্টের সাথে তিনি দেখেন, কীভাবে সায়রা ধীরে ধীরে তার স্বামীর মন এবং ঘর দখল করে নিচ্ছেন। তাদের বিয়ে বার্ষিকীতে যখন তিনি আব্বাসের কাছে এক সন্ধ্যা সময় কাটানোর আবদার করেন এবং আব্বাস তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেন, তখনই বানোর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। তিনি ব্যাগ গুছিয়ে সন্তানদের নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান।
তাকে ফিরিয়ে আনার বদলে আব্বাস সন্তানদের জন্য মাসে ৪০০ টাকা করে পাঠাতে শুরু করেন। কিন্তু কয়েক মাস পর সেই টাকাও বন্ধ হয়ে গেলে বানো বাধ্য হয়ে আব্বাসের বাড়িতে গিয়ে টাকার কথা বলেন। উল্টো আব্বাস বানোকে বিয়ের পবিত্রতা নষ্ট করা এবং তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য তিরস্কার করেন। আশপাশের সবাই আব্বাসকে সন্তানদের খাতিরে টাকা পাঠিয়ে দিতে বললেও তিনি বানোর কাছে মাথা নত করতে রাজি হননি। পরিবর্তে তিনি তাকে ডেকে পাঠান এবং তিনবার ‘তালাক’ বলে বিয়েবিচ্ছেদ করেন। এটিই ছিল বানোর খোরপোশের জন্য তার আইনি লড়াইয়ের সূচনা।
বানোর বাবা, যিনি একজন মুসলিম পণ্ডিত ছিলেন, তিনি তার মেয়ের প্রতি অটল সমর্থন ঘোষণা করেন। তিনি নিজের সমাজ এবং ইসলামী নেতাদের বিরুদ্ধে গিয়ে মেয়ের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ান। তাকে সমাজচ্যুত করা হয় এবং বলা হয়, যেন তিনি তার মেয়েকে স্বামীর বিরুদ্ধে না যাওয়ার শিক্ষা দেন। পুরো পাড়া-প্রতিবেশী দ্বারা একঘরে হওয়া সত্ত্বেও বানো এবং তার বাবা ন্যায়বিচারের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হন। সেখানে তাদের দেখা হয় আইনজীবী বেলা জৈন এবং ফারহান আনসারির সাথে, যারা সুপ্রতিষ্ঠিত আইনজীবী আব্বাস খানের বিরুদ্ধে মামলাটি লড়তে রাজি হন।
মামলা চলাকালীন বানো আব্বাসের বাড়ির পেছনের একটি ঘরে থাকতে শুরু করেন, যেটির মালিকানা আব্বাস আগে তার নামে লিখে দিয়েছিলেন। এর মধ্যেই বাবার মৃত্যু সংবাদে তিনি ভেঙে পড়েন। বাবার জিনিসপত্র গোছানোর সময় তিনি একটি চিরকুট পান যেখানে লেখা ছিল, ‘বানোই সঠিক।’ এটি তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিলেও তার ভেতরে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
১৯৮০ সালে নি¤œ আদালতে হেরে যাওয়ার পর আব্বাস হাইকোর্টে আপিল করেন এবং সেখানেও পরাজিত হন। তবে তিনি বেলা জৈনের কাছে স্বীকার করেন, তিনি ইচ্ছা করেই পরাজয় মেনে নিয়েছেন যাতে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যাওয়া যায় এবং শরিয়াহ আইনের গুরুত্ব প্রমাণ করা যায়। বানো যখন তার খোরপোশের অধিকারের জন্য লড়াই করছিলেন, তখন ইসলামী নেতারা তার এই কাজকে শরিয়াহ আইনের অবমাননা হিসেবে নিন্দা জানান। আব্বাস চেয়েছিলেন আগের রায় বাতিল করে ধর্মনিরপেক্ষ আদালতের সামনে শরিয়াহ আইনের শক্তি প্রমাণ করতে।
১৯৮৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে ইসলামিক আইন এবং ধর্মনিরপেক্ষ আইনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এটি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আব্বাসের বক্তব্য বানোর বিপক্ষে যাওয়ার উপক্রম হয়। তিনি যুক্তি দেন, এই মামলাটি ধর্মনিরপেক্ষ আদালতে আসা উচিত ছিল না, কারণ ইসলামিক বোর্ডগুলো তাকে সাহায্য করতে পারত; কিন্তু বানো তার বিশ্বাস হারাননি।
১৯৮৪ সালের শুনানিতে বানো নারীদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আইনের বিষয়ে একটি আবেগঘন বক্তব্য দেন। তিনি জোরালোভাবে বলেন, পুরুষরা কীভাবে বারবার কুরআনের পবিত্রতা নষ্ট করেছে এবং সুবিধামতো মুসলিম নারীদের চুপ করিয়ে রাখতে ধর্মকে ব্যবহার করেছে। তিনি গত এক দশকে তার সন্তানদের কষ্টের কথা তুলে ধরে নিজের খোরপোশের অধিকার দাবি করেন, তার সন্তানরা স্কুলের চেয়ে আদালতের দেয়াল বেশি চিনেছে। বানো বুঝতে পারেন এই লড়াই শুধু তার একার নয়। যে নারী নিজেকে অশিক্ষিত ভেবে হীনম্মন্যতায় ভুগতেন, তিনিই কুরআনের অগাধ জ্ঞান দিয়ে মোড় ঘুরিয়ে দেন সেই একই পবিত্র গ্রন্থ যা আব্বাস মামলা খারিজ করতে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছিলেন।
এক বছর পর সুপ্রিম কোর্ট বানোর পক্ষে রায় দেয় এবং মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ আইন প্রয়োগের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। বানো কেবল ধারা ১২৫-এর অধীনে খোরপোশের অধিকারই পাননি; বরং এই মামলাটি হাজার হাজার নিঃস্ব মুসলিম নারীকে তাদের অধিকার আদায়ে সাহায্য করেছে। ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়ার পরও বানো তরুণীদের কুরআন শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে তার জীবন অতিবাহিত করেন।