জুলাই সনদ এবং গণভোট বড় রাজনৈতিক ইস্যু হতে যাচ্ছে
Printed Edition
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
২০২৫ সালের জুলাই সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট বাংলাদেশে সাংবিধানিক সংস্কারের নতুন পথ খুলে দিলেও এর বাস্তবায়নকে ঘিরে বড় ধরনের রাজনৈতিক মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটারের ‘হ্যাঁ’ ভোটে সনদটি অনুমোদন পেলেও বিএনপিসহ কয়েকটি দল সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন তুলেছে। একই সাথে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দ্বিতীয় শপথ প্রত্যাখ্যান করায় সংস্কারের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এ দিকে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ এবং গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করায় বিষয়টি আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর ঘোষিত আদেশ অনুযায়ী ৮৪টি সংশোধনী সংবলিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার জুলাই সনদের পে মত দেন। এর আগে ২৪টি রাজনৈতিক দল এই সনদ বাস্তবায়নে স্বার করেছিল। তবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে স্বারকারী দলগুলোর মধ্যেই কিছু মতপার্থক্য ছিল। বিশেষ করে উচ্চকরে গঠন, মতা এবং কয়েকটি সাংবিধানিক সংস্থার স্বাধীনতা নিয়ে আপত্তি উঠে আসে।
বিএনপি সনদের পে থাকলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলটি। পরে বিষয়টি আদালতে গড়ালে সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার সময় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছে। অনেক পর্যবেকের মতে, নবনির্বাচিত সংসদ এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য সাংবিধানিক পদ্ধতিতে, অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে সংশোধনী আনার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে।
বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়ায় এই পরিষদ আদৌ গঠন হবে কি না- তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে নানা বক্তব্য আসতে পারে। তবে যেসব বিষয়ে আদালতে রিট হয়েছে, সেসব বিষয়ে আদালত থেকে কী নির্দেশনা আসে, সেটিও সংসদকে আইন প্রণয়নের সময় বিবেচনায় নিতে হবে। ফলে জুলাই সনদ ও গণভোটের বৈধতার প্রশ্নে আদালতের সিদ্ধান্ত এবং এ নিয়ে বিএনপির সাথে জামায়াত-এনসিপির রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কত দূর গড়ায়- তার ওপর রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতি অনেকটাই নির্ভর করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সব মিলিয়ে জুলাই সনদই আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পটভূমি অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বারিত হয়। একই বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। এর পর সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে জনগণের সম্মতি যাচাইয়ের জন্য ২৫ নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। সেই অধ্যাদেশের ভিত্তিতেই ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন একযোগে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হয়।
তবে এর পরপরই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে দুটি রিট দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী। রিটে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-কে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করার আবেদন জানানো হয়। একই সাথে এই অধ্যাদেশ ও সনদের আওতায় কোনো কার্যক্রম কার্যকর না করার নির্দেশনাও চাওয়া হয়। রিটে বলা হয়, বিদ্যমান সংবিধানে গণভোট বা জুলাই জাতীয় সনদের মতো কোনো বিধান নেই।
আদালত জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোট অধ্যাদেশ এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে- জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সংসদ সচিবালয় থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে দেয়া চিঠি কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না। একই সাথে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ৩ নম্বর তফসিল- যার অধীনে রাজনৈতিক দলগুলো ৩০টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে ছিল, তা কেন বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
রিট দায়েরের রাতেই জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও আইনজীবী শিশির মনির রিটকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করেন। তার দাবি, তাড়াহুড়ো করে দুই আইনজীবীর মাধ্যমে রিট দায়েরের পেছনে সরকারের ইন্ধন রয়েছে।
জুলাই সনদ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া অভিযোগ করেন, সরকারি দল বিএনপি এ বিষয়ে এক ধরনের ‘ডুয়েল গেম’ খেলছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি একদিকে রাজনৈতিকভাবে সনদের পে অবস্থান দেখালেও অন্যদিকে আদালতের মাধ্যমে এটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আদালত থেকে যে সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা আসবে, সেটি সংসদকেও বিবেচনায় নিতে হবে, যাতে আইন প্রণয়নের পর আবার আদালতে তা বাধাগ্রস্ত না হয়। তিনি আরো বলেন, বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো বিধান নেই। ফলে এই ধরনের পরিষদ গঠন করতে হলে সংসদে আলোচনা ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই তা করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রশ্নে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির অবস্থানগত পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখন দেখার বিষয়- এই পার্থক্য কত দূর অগ্রসর হয়। তার মতে, সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপির মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা ল্য করা যাচ্ছে। ফলে সরকারবিরোধী দলগুলো যদি বিষয়টি নিয়ে চাপ সৃষ্টি করে, তবে এটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হতে পারে।
বিএনপির একাধিক নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে, দলটি দুটি সম্ভাব্য পথ বিবেচনা করছে। প্রথমত, সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক- এই যুক্তিতে তারা জুলাই সনদকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। সে েেত্র সনদের কার্যত সমাপ্তি ঘটবে। দ্বিতীয়ত, সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সনদের বাস্তবায়নের পথও খোলা রয়েছে। তবে দলীয় আলোচনায় দ্বিতীয় বিকল্পটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি এহসান এ সিদ্দিক বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জুলাই সনদের গণভোটের বৈধতা নিয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রশ্ন তোলা তাৎপর্যপূর্ণ এবং সন্দেহজনক। তার মতে, এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে বিএনপি এই গণভোটের ঐতিহাসিক রায়ের অধীনে পরিচালিত হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী নয়। অথচ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই প্রকাশ্যে তার সমর্থকদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তিনি আরো বলেন, জুলাই সনদের প্রস্তাবিত অনেক সাংবিধানিক পরিবর্তন সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েও বাস্তবায়ন করা সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ ১৯৮৯ সালের অষ্টম সংশোধনী মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দিয়েছিলেন- সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েও পরিবর্তন করা যাবে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধানের ধারাবাহিকতায় নয়, বরং গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মতায় এসেছে। সরকার যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছে এবং গণভোটে মানুষ যে রায় দিয়েছে, সেখানেই এর রাজনৈতিক সমাধান নিহিত রয়েছে। তার মতে, গণভোট নিয়ে যে বিতর্ক এখন সৃষ্টি হয়েছে, তার সমাধান বিদ্যমান সংবিধানের ভেতরে খোঁজা হচ্ছে, অথচ সংবিধানে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই।
তিনি বলেন, জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর লিখিত অঙ্গীকার রয়েছে এবং এর অনেক বিষয় রাজনৈতিক সমঝোতার সাথে সম্পর্কিত, যা আদালতের এখতিয়ারের বাইরে থাকা উচিত। অন্যথায় ঐকমত্যের পরিবর্তে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তি ঐক্যবদ্ধ। সবাই এতে স্বার করেছে এবং গণভোটে বিপুল ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। তার মতে, জনগণের ম্যান্ডেটই সর্বোচ্চ। তাই সব রাজনৈতিক দলকে এই গণভোটের রায় মানতে হবে।
তিনি আরো বলেন, সরকার যদি গণভোটের রায় উপো করে, তা হলে তারা সংসদের ভেতরে এবং বাইরে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে। তবে তিনি একই সাথে আশা প্রকাশ করেন- এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে দেশে নতুন কোনো রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি না করে রাজনৈতিক সমঝোতার পথই বেছে নেয়া হবে।