চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি নিয়োগে বয়সসীমা কমানো ও অভিজ্ঞতার শর্ত নিয়ে নানা জিজ্ঞাসা

চট্টগ্রাম ব্যুরো
Printed Edition

চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে সংশোধনী এনে বয়স কমানো নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। একদিকে বিশেষ একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়ার জন্য এমন সংশোধনী বলে অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি কার্যকর হলে ওয়াসার মতো জনসম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান দক্ষতার অভাবে নানা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ারও আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।

ঢাকা ওয়াসা ও চট্টগ্রাম ওয়াসা ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো দু’টি মেগা সিটিতে পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কাজে নিয়োজিত দু’টি প্রতিষ্ঠান। এ দু’টি প্রতিষ্ঠানে এক দশকের বেশি সময় ধরে চুক্তিভিত্তিকভাবে নিয়োজিত ছিলেন বিগত সরকারের আস্থাভাজন প্রকৌশলী তাকসিম খান ও প্রকৌশলী এ, কে, এম ফজলুল্লাহ। বিগত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর নানাভাবে বিতর্কিত তাকসিম খান পালিয়ে গেলেও বিগত জানুয়ারি মাসে মন্ত্রণালয় কর্তৃক চুক্তি বাতিল করা পর্যন্ত প্রকৌশলী এ, কে, এম ফজলুল্লাহ স্ব-পদে বহাল ছিলেন। পরে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয় কর্তৃক দুই ওয়াসার বোর্ড বাতিল করে স্থানীয় সরকার বিভাগের দুই অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে কর্মসম্পাদনে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে দ্’ুটি কমিটি গঠিত হয়। কমিটিতে জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগের একজন করে প্রতিনিধি ও জনস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়াও কমিটিতে একজন ছাত্র প্রতিনিধি ও একজন পানি ব্যবহারকারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দু’টি কমিটি তাদের প্রথম সভায় দুই ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নির্ধারণ করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রদান করে। চট্টগ্রাম ওয়াসার বিজ্ঞপ্তিটি গত ২৪ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। যেখানে উল্লেখযোগ্য যোগ্যতা ছিল প্রার্থীর বয়স হবে ৫৫ থেকে ৬৫ বছর, পানি সরবরাহ ও সেনিটেশন বিষয়ে কারিগরি জ্ঞান ও ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা অথবা সাধারণ প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় সিনিয়র পর্যায়ে অন্তত ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা ও নূন্যতম ৩য় স্কেলধারী বা সমপর্যায়ের স্কেলধারী হতে হবে। এটি মূলত ঢাকা ওয়াসার ২০১৬ ইং সালে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির আলোকে করা হলেও মোটামুটিভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উপযুক্ত অনেক প্রার্থী আবেদনের সুযোগ ছিল।

পক্ষান্তরে ঢাকা ওয়াসার বিজ্ঞপ্তিতে বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৬০ নির্ধারণ করে। যদিও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রকে সঙ্কোচিত করে বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দানের উদ্দেশ্যে বয়সসীমা কমানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কিন্তু চলতি মাসের ৭ তারিখে চট্টগ্রাম ওয়াসা সংশোধিত বিজ্ঞাপন জারি করে ঢাকা ওয়াসার আদলে বয়সসীমা ৬০ নির্ধারণসহ সংকীর্ণতার পথ অনুসরণ করা সংশ্লিষ্টদের দাবি।

ওয়াসা-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সাথে আলাপ করে জানা গেছে, বর্তমানে যেখানে পি.আর.এলসহ একজন কর্মকর্তার চাকরির বয়স ৬০ বছর, সেক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৬০ বছর নির্ধারণ অযৌক্তিক। সরকার ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, স্বরাষ্ট্রসচিবসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগদান করেছেন, যাদের বয়স ৬৫ বছর বা তারও বেশি। খোদ ঢাকা ওয়াসা ও চট্টগ্রাম ওয়াসার সদ্য বিদায়ী দুই সাবেক এমডি প্রায় ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন সাধারণত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয় অধিকতর দক্ষ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিকে যাতে তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা থেকে প্রতিষ্ঠান উপকৃত হয়। সেখানে সর্বোচ্চ ৬০ বছর বয়স নির্ধারণ কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি মূলত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রকে সঙ্কোচিত করে বিশেষ কাউকে সুবিধা প্রদানের জন্য করা হয়েছে বলে ইতোমধ্যে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক একটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। যেখানে আছে সাধারণ প্রশাসন, অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং কারিগরি বিভাগ। সেখানে কারিগরি জ্ঞানকে একমাত্র যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নাই। এতে করে সমগ্র বাংলাদেশে দু’-চারজন ছাড়া কেউ আবেদন করারও সুযোগ পাবে না। ফলে এমডি হওয়ার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই বৈষ্যমের শিকার হবেন।

এতে প্রশাসনের বিভিন্ন সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ব্যক্তিরা আবেদনেরই সুযোগ পাবেন না। ফলে ওয়াসার সামগ্রিক কার্যক্রমে অভিজ্ঞতার সঙ্কট দেখা দেবে বলে সূত্রের দাবি।

ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডির যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়, কর্ম-সহায়তা-সংক্রান্ত কমিটির সভায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে; কিন্তু উক্ত সিদ্ধান্ত কোনো সভা ছাড়াই পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে করে কোটা প্রথার মতো কম যোগ্যতাধারীরাই চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলেও সূত্রের দাবি। তা ছাড়া এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং সামগ্রিকভাবে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্য যথেষ্ট বলে সূত্রের মতো।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার সচিবের বক্তব্য নিতে সেল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও অপর প্রান্ত হতে সাড়া মিলেনি।