ঈদ সালামি যেভাবে এলো : আনোয়ার আল ফারুক
Printed Edition
ঈদ সালামির প্রচলনটা ঠিক কখন কোথায় থেকে শুরু হয়েছে তা অনুমান করা কঠিন হলেও এ কথা ঠিক- মুসলিম উম্মাহর মধ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী এই প্রচলনটা চলে আসছে। দেশ জাতি জনগোষ্ঠীভেদে ধরন পাল্টালেও একেক দেশে একেক কায়দায় এই ঈদ সালামির প্রচলন আছে। হাদিয়া দেয়ার ফজিলত সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন- ‘যারা তাদের সম্পদ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করে, অতঃপর খোটা বা তুলনা দিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে তার অনুগমন করে না। তাদের জন্য রবের কাছে রয়েছে তাদের বিনিময়, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।’ (সূরা বাকারা-২৬২) হাদিয়া ব্যবহার করতে নিষেধ নেই। এ মর্মে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন- ‘তারা যদি খুশি হয়ে তোমাদেরকে (কিছু) দিয়ে দেয়, তাহলে তোমরা তা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করো।’ (সূরা নিসা, আয়াত-৪) হাদিয়া আদান-প্রদানে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির পারস্পরিক হৃদ্যিক ও আত্মিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়। পরস্পরের প্রতি সহানুভুতি হৃদ্যিক সম্পর্ক তৈরিতে হাদিয়া এক অতুলনীয় মাধ্যম। এই কারণে আল্লাহর রাসূল সা: হাদিয়া আদান-প্রদানে খুব বেশি তাগিদ দিয়েছেন। নিজেও যথেষ্ট পরিমাণ হাদিয়া দিয়ে সমাজ জাতির জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। পাশাপাশি কেউ হাদিয়া দিলে সেটি পূর্ণ আন্তরিকতায় স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে গ্রহণ করতেন। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা রা: বলেন, রাসূল সা:-এর নিয়ম ছিল তিনি হাদিয়া গ্রহণ করতেন এবং এর বিনিময়ে নিজেও কিছু হাদিয়া হিসেবে দিয়ে দিতেন।’ (বুখারি) জাবের রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী করিম সা: বলেন, ‘যাকে হাদিয়া দেয়া হয় যদি তার কাছে হাদিয়ার বদলে দেয়ার মতো কিছু থাকে তাহলে দিয়ে দেবে। আর যার কাছে দেয়ার মতো কিছুই থাকে না তখন সে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তার প্রশংসা করে দেবে এবং তার ব্যাপারে ভালো কথা বলে দেবে। যে এমন করল সে কৃতজ্ঞতা আদায় করল। আর যে এমন করল না এবং উপকারকে গোপন করল সে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল।’ (জামে তিরমিজি) নবী করিম সা: বলেন, ‘তোমরা পরস্পর হাদিয়া আদান-প্রদান করো, তাহলে মহব্বত বৃদ্ধি পাবে।’ (আল আদাবুল মুফরাদ-৫৯৪) পাশাপাশি হাদিয়া পরস্পরের মনে বিরাজিত হিংসা বিদ্বেষ দূরীকরণে বিশেষ কার্যকর ভূমিকা রাখে। রাসূল সা: বলেন, ‘তোমরা পরস্পরে হাদিয়া বিনিময় করো এর দ্বারা অন্তরের সঙ্কীর্ণতা ও হিংসা দূর হয়ে যায়।’ (মুসনাদে আহমাদ-৯২৫০) রাসূলুল্লøাহ সা: বলেছেন, ‘যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য (কাউকে কিছু) দেয়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই দেয়া থেকে বিরত থাকে; আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই যে ভালোবাসে আর আল্লাহর জন্যই যে ঘৃণা করে, সে তার ঈমান পূর্ণ করল।’ (তিরমিজি-২৫২১)
উপরোক্ত আয়াতে কারিমা ও হাদিসে নববী প্রমাণ করে হাদিয়া দেয়া-নেয়া আমাদের প্রিয় নবী সা:-এর সুন্নাত। এই ফজিলতপূর্ণ আমল রাসূলে আকরাম সা: তাঁর জিন্দেগিতে বাস্তবায়ন করেছেন আর সাহাবায়ে কিরামগণও রাসূলে আমিনের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে পরিবার-পরিজনদের ছোট সদস্য যারা রয়েছে তাদের হাতে উপহার-উপঢৌকন তুলে দেয়ার রেওয়াজ বহুকালের পুরনো। আরবের প্রচলিত রীতি হলো ছোটদের হাতে এই উপঢৌকন তুলে দেয়া। তারা ঈদের নামাজ আদায় করতে যাওয়ার পথে ছোট ছোট শিশুদের হাতে শুভেচ্ছা স্বরূপ দিনার দিরহাম তুলে দিতেন। সেই দিকে ধীরে ধীরে এই রেওয়াজ গোটা উম্মাহর মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল ইন্দোনিশিয়ার পুরনো সংস্কৃতি ঈদ উপলক্ষে পরিবার কিংবা স্বজনদের মধ্যে বিশেষ করে ছোট সদস্যদের আর্থিক উপঢৌকন দেয়া। তারা খাম ভর্তি করে সবাইকে এই উপঢৌকন দিয়ে থাকে। শিশুরাও ঈদ উপলক্ষে এই উপঢৌকনের জন্য মুখিয়ে থাকে। তাদের ঈদ আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে এই ঈদ উপঢৌকন বা ঈদ সালামি। পাকিস্তানে ঈদ সালামির প্রচলনও ওদের নিজস্ব সাংস্কৃতির একটি অংশ। ছোটদের বিভিন্ন উপহার সামগ্রীর সাথে আর্থিক উপহার দিয়ে থাকে। সেখানেও ছোটরা ঈদ উপলক্ষে বড়দের থেকে এই উপহার পেয়ে ঈদকে আরো অনেক অনেক বেশি আনন্দঘন করে তোলে।
ইসলামী ইতিহাস ঐতিহ্যের আরেক পাদভূমি তুরস্কেও রয়েছে ছোটদের ঈদ সালামির নানা আয়োজন। স্বজনরা শিশুদের নতুন জামাকাপড়, চকলেটসহ নানা মুখরোচক খাবারের প্যাকেট আর নগদ টাকা দিয়ে থাকেন ঈদ সালামি হিসেবে। সেখানে এই উপহার প্রচলন শুধু ছোটদের জন্য সীমাবদ্ধ নয় পরিবারের বড় সদস্যরাও একে অপরের সাথে এই উপহার সামগ্রী আদান-প্রদান করে থাকেন। আরব অঞ্চলের দেশগুলোতে ঈদ উপলক্ষে পরিচিত অপরিচিত সব শিশুকে বড়রা ঈদ সালামি স্বরূপ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী দিয়ে থাকেন। শপিংমলে ঈদ উপলক্ষে শিশুদের মাঝে বিভিন্ন খেলনা সামগ্রী ফ্রি বিতরণ করা হয়। নগদ টাকা তুলে দেয়া হয় ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের হাতে। ইরানে রয়েছে ঈদ সালামির বিভিন্নতা। তারা ঈদ উপলক্ষে শিশুদের হাদিয়া দিয়ে থাকেন। এই হাদিয়ার মধ্যে রয়েছে জামাকাপড়, জায়নামাজ, ওয়ালমেট, নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র ও খেলনাসামগ্রী।