ফুটপাথে উপচে পড়া ভিড়, হাসি ফুটছে সাধারণ মানুষের মুখে
ঈদ বাজার
Printed Edition
হাবিবুল বাশার
ঈদ উপলক্ষে মার্কেট শপিংমলে ভিড় বাড়ছে। তবে শপিংমলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গণ্ডির চেয়ে তপ্ত ফুটপাথে উপচেপড়া ভিড় চোখে পড়ছে। মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস আর নিম্নবিত্তের টানাটানির সংসারে ঈদ মানেই এক বড় চ্যালেঞ্জ। রমজানের দীর্ঘ উপবাস আর অভাবের লড়াই শেষে নিজের নতুন জামার চেয়ে সন্তানের হাসিটাই যেখানে মুখ্য, সেখানে রাজধানীর ফুটপাথগুলোই হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের ‘ঈদের স্বর্গরাজ্য’। এক চিলতে নতুন পোশাকের ঘ্রাণে সব অভাব ভুলে যাওয়ার এক অদ্ভুত লড়াই চলছে বাড্ডা থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত।
জনসমুদ্র এখন ফুটপাথ : রাজধানীর বাড্ডা, নিউমার্কেট, মিরপুর, ফার্মগেট, গুলিস্তান ও যাত্রাবাড়ী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তিল ধারণের ঠাঁই নেই ফুটপাথে। বিভিন্ন বিপণন সংস্থার প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঢাকার প্রায় ৫০ শতাংশ সাধারণ মানুষ তাদের ঈদের প্রাথমিক কেনাকাটা সারেন এই অস্থায়ী দোকানগুলো থেকে। সকালের মিষ্টি রোদ থেকে শুরু করে ইফতারের আগ মুহূর্ত এবং তারাবির পর গভীর রাত পর্যন্ত বিকিকিনি চলছে বিরতিহীন। বড় বড় শপিংমলের ঝকঝকে কাচের দেয়ালের ঠিক নিচেই গড়ে ওঠা এই দোকানগুলো এখন যেন শহরের মূল হৃদস্পন্দন। ক্রেতাদের ভিড়ে অনেক জায়গায় হাঁটার পথটুকুও বন্ধ হয়ে গেছে, তবুও মানুষের ক্লান্তি নেই।
যা মিলবে ঢাকার ফুটপাথে
ফুটপাথের এই দোকানগুলো যেন এক একটি ‘মিনি মল’। এখানে আভিজাত্যের চেয়ে প্রয়োজনীয়তা আর বৈচিত্র্য বেশি গুরুত্ব পায়। ছোট শিশুদের রঙ-বেরঙের ফ্রক থেকে শুরু করে হাল আমলের স্টাইলিশ টি-শার্ট, বড়দের আভিজাত্যপূর্ণ পাঞ্জাবি কিংবা মা-বোনদের জন্য কারুকাজ করা থ্রি-পিস ও সুতি শাড়ি সবই মিলছে সারিবদ্ধ এই দোকানগুলোতে। বাদ যাচ্ছে না জুতো, বেল্ট, টুপি কিংবা কৃত্রিম গয়নাও। বিক্রেতারা বলছেন, ‘আমাদের এখানে ফ্যাশন আর সাধ্যের কোনো দূরত্ব নেই।’ ক্রেতাদের পছন্দ বুঝতে তারাও চেষ্টার কমতি রাখছেন না।
সাধ্যের মধ্যে সাধপূরণ
শপিংমলের আকাশচুম্বী দামের কাছে যখন মধ্যবিত্তের স্বপ্ন থমকে দাঁড়ায়, তখনই ফুটপাথ হয়ে ওঠে তাদের পরম বন্ধু। নিউমার্কেটের ফুটপাথে সন্তানের জন্য জামা কিনছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আহমেদ হোসেন। ক্লান্ত মুখে তৃপ্তির হাসি নিয়ে তিনি বলেন, ‘দোকানে যে পাঞ্জাবি আড়াই হাজার টাকা, এখানে সেটা দরদাম করে সাত শ’ টাকায় পাওয়া যায়। বড় বড় এসি মার্কেটে গেলে পকেটের দিকে তাকালে ভয় লাগে, আর ফুটপাথে আসলে মনে হয় অন্তত সবার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারব। আমাদের মতো মানুষের কাছে এটাই তো ঈদ নিজের অভাব গোপন করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো।’
ফার্মগেটের ফুটপাথে কথা হয় রাজমিস্ত্রি আব্দুল জলিলের সাথে। ২৬ রোজা সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে তিনি এসেছেন পরিবারের জন্য কেনাকাটা করতে। ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে তিনি তার কষ্টের কথা ভাগ করে বলেন, সকল পেশায় বকশিশের সুযোগ থাকলেও রাজমিস্ত্রিদের তেমন আলাদাভাবে কেউ কিছু দেয় না। বড় মার্কেটে ঢোকার কথা আমরা চিন্তাই করতে পারি না। দুই মেয়ে, তাদের মা আর গ্রামে আমার বৃদ্ধ মা আছে সবার জন্য কিছু না কিছু তো কিনতেই হবে। এই ফুটপাথই আমাদের ভরসা।
বিক্রেতাদের ব্যস্ততা ও শেষ সময়ের প্রত্যাশা
ফুটপাথের বিক্রেতাদের কাছেও এই ঈদ এক বড় পরীক্ষা। ইফতারের আগ মুহূর্তে গুলিস্তানের এক বিক্রেতা জানান, রমজানের শুরুতে বিক্রি আশানুরূপ ছিল না। তবে ২৬ রমজানের পর থেকে দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। তিনি বলেন, গতবারের তুলনায় এবার রমজানের প্রথম দিকে তেমন কোনো আশা দেখি নাই। মনটা খারাপ ছিল। কিন্তু ২৬ রমজানের পর থেকে ক্রেতাদের ভিড় দেখে মনে হইতাছে এবার বেচাকিনা একটু করতে পারব। মানুষের হাতে টাকা কম, তাও সবাই তো চায় নতুন জামা গায়ে দিতে।
বিখ্যাত সাহিত্যিকদের ভাষায় যেমন বলা হয়, মানুষের অভাব যখন বেশি হয়, তখন ছোট ছোট প্রাপ্তিও আকাশছোঁয়া আনন্দ দেয়। ফুটপাথের বিক্রেতা ও ক্রেতাদের এই মেলবন্ধন যেন সেই কথাটিই মনে করিয়ে দেয়। ক্রেতাদের দাবি, দরদামের সুযোগ আর তুলনামূলক কম দামই তাদের এখানে টেনে আনে।
ফুটপাথ মানেই নিম্নমানের পণ্য, এই ধারণা ভেঙে এখন অনেক সচেতন মধ্যবিত্ত পরিবারও ভিড় করছেন এখানে। কারণ দিনশেষে ঈদের আনন্দটা দামি ব্র্যান্ডের লোগোতে নয়, বরং রমজানের ত্যাগের পর পবিত্র ঈদুল ফিতরে প্রিয়জনের গায়ে নতুন কাপড় জড়ানোর তৃপ্তিতেই সীমাবদ্ধ। আর এই হাজারো মানুষের স্বপ্ন আর সাধ্যের সেতুবন্ধন হয়ে প্রতি বছর এভাবেই জেগে থাকে রাজধানীর ফুটপাথগুলো।