সংসদে পাল্টাপাল্টি বিতর্কের পর বিরোধী দলের ওয়াকআউট
Printed Edition
সংসদ প্রতিবেদক
- গতকালের ২৪ বিলসহ মোট ৯১ বিল পাস ষ ৫ অধ্যাদেশ বাতিল করেছে সরকার
- সংসদে উত্থাপন না করায় ‘ল্যাপস্’ হয়ে গেল ১৫ অধ্যাদেশ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের লক্ষ্যে গতকাল শুক্রবার ২৪টিসহ জাতীয় সংসদে মোট ৯১টি অধ্যদেশ পাস হয়েছে। ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ সংশোধনীসহ পাস এবং ‘ব্যাংক রেজুলিউশন বিল, ২০২৬’ বিল নিয়ে আপত্তি জানায় বিরোধী দল। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা এ নিয়ে সরকারি দলের সাথে তর্কে জড়ান। এক পর্যায়ে এতে অংশ নেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানও। গতকাল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন না করা এবং আপত্তি সত্ত্বেও সংশোধনী এনে সরকারি দল ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ পাস করায় চতুর্থবারের মতো ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে সন্ধা ৭টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত নামাজের বিরতিসহ অধিবেশন চলে। আগামী বুধবার সকাল ১১টা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। জুমার নামাজের পর অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সংসদের বিশেষ কমিটি ৯৮টি অপরিবর্তিতভাবে এবং ১৫টি সংশোধনসহ পাসের সুপারিশ করে। এ অধ্যাদেশগুলো ৯১টি বিল আকারে পাস করা হয়েছে বলে জানান আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। যদিও বিরোধী দল থেকে বলা হয়, আরো বাকি ২০টির মধ্যে চারটি বাতিল এবং ১৬টি আরো শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে আনার সুপারিশ করা হয়। তবে, এ ১৬টির মধ্যে মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি বাতিল করে ২০০৯ সালের পুরনো আইনে ফিরে যায় সরকার। সে অনুযায়ী মোট পাঁচটি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে সরকার। ফলে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা বাকি ১৫টি অধ্যাদেশ গতকাল নির্ধারিত সময়ে উত্থাপন না করায় ‘ল্যাপস্’ হয়ে গেল।
সংশোধনীসহ ২৪ বিল পাস
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে গতকাল সংশোধনসহ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ এবং ‘ব্যাংক রেজুলিউশন বিল, ২০২৬’-সহ মোট ২৪টি বিল পাস হয়েছে। পাস হওয়া বিলগুলোর মধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের ‘নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’; বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’; ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’; ‘কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’; ‘রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’; সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) বিল, ২০২৬’; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন বিল, ২০২৬’; ‘বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিল, ২০২৬’; অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘আমানত সুরক্ষা বিল, ২০২৬’; ‘এক্সাইজেস অ্যান্ড সল্ট বিল, ২০২৬’; মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) বিল, ২০২৬’; ‘গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, ২০২৬’; বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, ২০২৬’; অর্থ ২০২৫-২০২৬ অর্থবছর বিল, ২০২৬’; শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিল, ২০২৬’ ও বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত কতিপয় আইন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’; ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ‘জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা বিল, ২০২৬’ ও ‘সাইবার সুরক্ষা বিল, ২০২৬’ মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল, ২০২৬’ পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং বিলগুলো সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, ২০২৬’; পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘ব্যাংক রেজুলিউশন বিল, ২০২৬’ সংসদে পাসের জন্য উত্থাপন করার প্রস্তাব করলে ঢাকা-১২ আসনের বিরোধী দলের (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য সাইফুল আলম মিলন বিলটি উত্থাপনের বিরোধিতা করে বিলটির ওপর জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব করেন। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম বিষয়টি ভোটে দেন। পরে কণ্ঠভোটে জনমত যাচাই প্রস্তাবটি নাকচ হয় এবং বিলটি পাস হয়।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ পাসের প্রস্তাব করলে মাদারীপুর-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য আনিছুর রহমান এ বিলের ওপর তিনটি সংশোধন প্রস্তাব করেন। পরে স্পিকার তার সংশোধনীগুলো গ্রহণ করেন। পরে বিলটি সংসদে স্থিরকৃত আকারে পাস হয়। গতকাল অধিবেশনে সর্বশেষ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
নির্ধারিত সময়ে উত্থাপন না হওয়ায় যেসব অধ্যাদেশ ল্যাপস হয়ে গেল
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন ও পাস না করলে সংসদ শুরুর এক মাসের মধ্যে অটোমেটিক ল্যাপস হওয়ার কথা। সেই অনুযায়ী গতকাল ছিল শেষ দিন। বিশেষ কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরবর্তী সময়ে যাচাই বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করে। যদিও বিশেষ কমিটির এই বৈঠকে বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা এতে বিরোধিতা করেন। ১৬টি অধ্যাদেশের মধ্যে মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত একটি আদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের পুরনো আইন ফিরিয়ে আনে সরকার। গতকাল নির্ধারিত সময়ে সংসদে উত্থাপন না করায় যেসব অধ্যাদেশ অটোমেটিক বাতিল হয়ে যাচ্ছে, সেগুলো হলো- রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫; রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫; গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫; জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫; বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন), ২০২৬; বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬; গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬; মাইক্রো ফাইন্যান্স ব্যাংক ও তাদের ২০২৬, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬। তবে, এই তালিকায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪-ও রয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, যে ৯১টি বিল পাস হলো একেকটা বিলের মধ্যে এমনও আছে দুই-চারটা অধ্যাদেশও আছে।
বিতর্কের সূত্রপাত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ পাসের প্রস্তাব করলে মাদারীপুর-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য আনিছুর রহমান এই বিলের ওপর তিনটি সংশোধন প্রস্তাব করেন। এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ এ বিষয়ে বলেন, বিশেষ কমিটির সভা অনুযায়ী অধ্যাদেশটা হুবহু পাস করার কথা ছিল। হঠাৎ করেএই সংশোধন আনায় সমঝোতা ভঙ্গ হয়েছে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, বিলটি পাসের মাত্র আধা ঘণ্টা আগে একটি সংশোধনী এনে পূর্বের ঐকমত্যকে নস্যাৎ করা হয়েছে, যা সংসদীয় রীতিনীতি ও রাজনৈতিক আস্থার পরিপন্থী। তিনি এই ঘটনাকে ‘দিনেদুপুরে রাজনৈতিক জোচ্চুরি’ এবং ‘প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের মহোৎসব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
বিরোধী দলের প্রধান আপত্তি ছিল জাদুঘরের পরিচালনা পর্ষদের কাঠামো নিয়ে। পূর্ববর্তী প্রস্তাবে একজন বিশেষজ্ঞকে পর্ষদের প্রধান করার কথা থাকলেও সংশোধনীর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে চেয়ারম্যান করার প্রস্তাব আনা হয়। বিরোধী দল এটিকে সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে এবং দাবি করছে, এটি প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণœ করবে। তারা উদাহরণ টেনে বলে, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি বা জাতীয় জাদুঘরের মতো প্রতিষ্ঠানে সাধারণত বিশেষজ্ঞদেরই দায়িত্ব দেয়া হয়। তাদের মতে, সরকার পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ করছে এবং এই বিল তারই ধারাবাহিকতা।
এ ছাড়া বিরোধী দল অভিযোগ করে, সরকারের বিভিন্ন খাতে ইতোমধ্যে দলীয়করণের প্রবণতা স্পষ্ট। ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান; এমনকি ক্রীড়া সংগঠনগুলোতেও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে তারা সতর্ক করে দেয় যে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা মনে করে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান একটি সর্বদলীয় ও সর্বস্তরের অংশগ্রহণে সংঘটিত ঐতিহাসিক ঘটনা; সেই স্মৃতি সংরক্ষণের প্রতিষ্ঠানকে এককভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা হলে এর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
অন্য দিকে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, সংশোধনীটি সরকার আনেনি, বরং একজন বেসরকারি সদস্যের প্রস্তাব হিসেবে এসেছে। তিনি যুক্তি দেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মন্ত্রীদের সভাপতিত্ব করা অস্বাভাবিক নয় এবং এটি দলীয়করণের শামিল নয়। আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেকোনো সংসদ সদস্য সংশোধনী প্রস্তাব দিতে পারেন এবং এই সংশোধনীর মাধ্যমে পর্ষদের ওপর সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তিনি আরো জানান, কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ আরো যাচাই-বাছাই করে শক্তিশালী করার জন্য বিলম্ব করা হচ্ছে।
তবে বিরোধী দল সরকারের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়নি। বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, শেষ মুহূর্তে আলোচনা ছাড়াই সংশোধনী আনা হলে তা আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করে এবং পূর্বের রাজনৈতিক সমঝোতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। তিনি আরো বলেন, ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ আটকে রেখে সরকার পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। সরকারের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে আলোচনার আশ্বাস দেয়া হলেও তা গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে সংসদে উত্তেজনা চরমে পৌঁছালে বিরোধী দল ওয়াকআউটের ঘোষণা দেয় এবং স্পিকারের উপস্থিতিতেই কক্ষ ত্যাগ করে। এটি চলতি অধিবেশনে তাদের চতুর্থ ওয়াকআউট।
‘ব্যাংক রেজুলেশন বিল’ নিয়ে বিতর্ক : কোটি কোটি আমানতকারীর সুরক্ষা এবং ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলা ঠেকানোর লক্ষ্যে বহুল আলোচিত ‘ব্যাংক রেজুলেশন বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। অধিবেশনে বিরোধী দলের আপত্তি ও জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব নাকচ করে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর আগে বিলটির ওপর বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সদস্য সাইফুল আলম মিলন (ঢাকা-১২) জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়ে এর কঠোর সমালোচনা করেন। বিলের বিরোধিতা করে সাইফুল আলম মিলন বলেন, ‘আমানতকারীর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। এই বিলের মাধ্যমে কোটি মানুষের আমানতের সুরক্ষাকে ধ্বংস করা হচ্ছে। অতীতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে ব্যাংক বাঁচানো হয়েছে, যা ছিল সাধারণ করদাতার টাকা। এই অধ্যাদেশ বা বিলটি বাতিল হলে লুণ্ঠনকারীরা আইনি ফাঁক দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আগে নিয়ম ছিল ব্যাংক ডুবলে শেয়ারহোল্ডাররা আগে ক্ষতি বহন করবে, আমানতকারীরা থাকবেন সুরক্ষিত। কিন্তু নতুন আইনি কাঠামোয় সেই চেইন অব কমান্ড ব্যাহত হতে পারে। ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে বেনামী মালিকানার মাধ্যমে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তা মোকাবেলায় আগের কঠোর আইনি কাঠামো বজায় রাখা জরুরি ছিল।’
সাইফুল আলম মিলন অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে সুস্পষ্ট আইনি ক্ষমতা ছিল, তা এই বিলের মাধ্যমে সঙ্কুচিত করা হতে পারে, যা ব্যাংক খাতের আস্থা আরো কমিয়ে দেবে।
জবাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা এবং গুড গভর্ন্যান্স- এই তিনটিই বিএনপির মূল নীতি। আমরা আমানতকারীদের সুরক্ষা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বাস্তবতা বুঝতে হবে। ইতোমধ্যে সরকার ব্যাংক খাতে ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, আরো প্রায় এক লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। সাধারণ সময়ে কোনো সরকারের পক্ষে এত বিশাল পরিমাণ অর্থ বহন করা সম্ভব নয়।’
মন্ত্রী আরো বলেন, এই বিলের মাধ্যমে একটি ‘নিউ উইন্ডো’ বা নতুন সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এটি একটি অল্টারনেটিভ অপশন। এর ফলে শুধু লিকুইডেশনের ওপর নির্ভর না করে বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে মূলধন পুনর্গঠনের সুযোগ থাকবে। এতে আমানতকারীদের আস্থা বাড়বে এবং ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডাররা সুরক্ষা পাবেন।
তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, লুণ্ঠনকারীদের ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং বাজারভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে সচল রেখে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা বজায় রাখাই এই বিলের মূল লক্ষ্য।
বক্তব্য শেষে সাইফুল আলম মিলন বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তাব করলে স্পিকার তা ভোটে দেন। তবে সরকারি দলের আপত্তিতে কণ্ঠভোটে সেই প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। এরপর অর্থমন্ত্রী বিলটি পাসের প্রস্তাব করলে তা সংসদে পাস হয়।