কৃষি উৎপাদন ও শ্রমিক মজুরিতে বৃদ্ধি ও স্থবিরতার মিশ্র চিত্র

পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

সার্বিকভাবে জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রান্তিকে বাংলাদেশের কৃষি খাতে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। কিছু খাদ্যশস্যে আবাদি জমি কমলেও সবজি ও ফল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়েছে। কৃষি শ্রমিকের মজুরি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও মৌসুমভেদে ওঠানামা লক্ষ্য করা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, বাজারদর, সেচ সুবিধা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার- এই চারটি বিষয় ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনের ধারা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কৃষি খাতের এই নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ নীতিনির্ধারণে সহায়ক হওয়ার পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি কৃষি খাত। উর্বর ভূমি, অনুকূল জলবায়ু এবং দীর্ঘদিনের কৃষি ঐতিহ্যের কারণে এ দেশে বহুমুখী ফসল উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। সর্বশেষ প্রান্তিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ১০.৯৪ শতাংশ এবং দেশের কর্মসংস্থানে কৃষি খাতে যুক্ত রয়েছে প্রায় ৪৪.৬৮ শতাংশ মানুষ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কৃষি খাতের এই গুরুত্বপূর্ণ অবদান বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিতভাবে প্রধান ও গৌণ ফসলের উৎপাদন এবং কৃষি শ্রমিকদের মজুরি সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করে থাকে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ঈৎড়ঢ় ঝঃধঃরংঃরপং ধহফ অমৎরপঁষঃঁৎধষ খধনড়ঁৎ ডধমব’ শীর্ষক প্রান্তিক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের জুলাই- সেপ্টেম্বর সময়কালের কৃষি উৎপাদন ও কৃষি শ্রমিকের মজুরি পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রান্তিক কৃষি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়কালে দেশের বিভিন্ন ফসলের উৎপাদনে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। কিছু খাদ্যশস্য ও তেলবীজের আবাদ কমলেও সবজি ও ফল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। একই সময়ে কৃষি শ্রমিকদের মজুরিতেও কিছুটা ওঠানামা দেখা গেছে।

বিবিএসের কৃষি শাখার তথ্য অনুযায়ী এই সময়ের পরিসংখ্যান ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের সাথে তুলনা করে প্রস্তুত করা হয়েছে।

খাদ্যশস্যে আবাদ কমেছে

গ্রীষ্মকালীন খাদ্যশস্যের মধ্যে ভুট্টা ও জোয়ার উৎপাদনের চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ সময়ে গ্রীষ্মকালীন ভুট্টার আবাদ ছিল প্রায় দুই লাখ ১৪ হাজার একর, যা ২০২৫-২৬ মৌসুমে কমে এক লাখ ৮৫ হাজার একরে নেমে এসেছে। উৎপাদনও কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৯০ মেট্রিক টনে, যেখানে আগের বছর ছিল ছয় লাখ ৩২ হাজার ৫৯৯ মেট্রিক টন।

অন্য দিকে জোয়ার বা সরঘামের আবাদ তুলনামূলকভাবে কম হলেও উৎপাদনে সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। আগের বছরে এর উৎপাদন ছিল প্রায় ৩৯ মেট্রিক টন, যা নতুন মৌসুমে বেড়ে ৮৭ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে।

কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্যশস্যের আবাদ কমার পেছনে জমির ব্যবহার পরিবর্তন, সবজি ও ফল চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধি এবং বাজারমূল্যের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তেলবীজ ফসলে সামান্য পরিবর্তন

তেলবীজ ফসলের মধ্যে গ্রীষ্মকালীন তিলের আবাদেও কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। আগের মৌসুমে প্রায় ২৭ হাজার একর জমিতে তিল চাষ হলেও নতুন মৌসুমে আবাদ কিছুটা কমে ২৬ হাজার একরের কাছাকাছি হয়েছে। উৎপাদনও সামান্য কমে ৬৫ হাজার মেট্রিক টনের মতো হয়েছে। তবে কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তেলবীজ ফসলের ফলন বৃদ্ধির জন্য উন্নত জাত ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

মসলা ফসলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি : গ্রীষ্মকালীন মরিচ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৪-২৫ সময়ে প্রায় ৫০ হাজার ৬২৪ একর জমিতে মরিচের আবাদ ছিল এবং উৎপাদন ছিল এক লাখ ৬৬ হাজার ৩৫৫ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে আবাদ সামান্য বেড়ে ৫১ হাজার ৩৮৮ একরে পৌঁছেছে এবং উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৯৮ হাজার ৪৬৪ মেট্রিক টনে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নত জাতের বীজ, সেচ সুবিধা এবং কৃষকদের বাজারমুখী উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে মরিচ উৎপাদনে এই বৃদ্ধি হয়েছে।

পামজাতীয় ফসলের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা গেছে। খেজুর, তালশাঁস ও পাকা তালের মতো ফসলের আবাদ কিছুটা কমলেও উৎপাদন মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, খেজুর ফলের আবাদ ২১ হাজার একর থেকে কমে ১৪ হাজার একরের কাছাকাছি হয়েছে। একই ভাবে তালশাঁস ও পাকা তালের ক্ষেত্রেও আবাদ কমেছে, তবে উৎপাদন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

সবজি উৎপাদনে বড় ধরনের বৃদ্ধি

এই প্রান্তিক প্রতিবেদনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো গ্রীষ্মকালীন সবজি উৎপাদনে বড় ধরনের বৃদ্ধি। বিভিন্ন সবজির উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

লতি কচু উৎপাদন বেড়ে হয়েছে প্রায় ৭৭ হাজার মেট্রিক টন, যা আগের বছর ছিল ৫১ হাজার টন। ঝিঙ্গা উৎপাদন ৮০ লাখ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৪ হাজার টনের বেশি। করলা উৎপাদন সাড়ে ৮৫ লাখ টন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ সাত হাজার টনে। চিচিঙ্গা উৎপাদন ৫৫ লাখ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ৭২ হাজার টন। শসা উৎপাদন এক লাখ ১৬ হাজার টন বেড়ে হয়েছে এক লাখ ৫২ হাজার টনের বেশি।

এ ছাড়া চালকুমড়া, পটল, পুঁইশাক, বেগুন, ডাঁটা শাক, কাঁকরোল এবং ঢেঁড়সের উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। এর মধ্যে বিশেষ করে বেগুন উৎপাদন আগের বছরের দুই লাখ ৫৮ হাজার টন থেকে বেড়ে তিন লাখ ২৬ হাজার টনের বেশি হয়েছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ ফলনশীল জাতের ব্যবহার, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং বাজারে চাহিদা বাড়ার কারণে সবজি উৎপাদনে এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

ফল উৎপাদনে ইতিবাচক প্রবণতা

ফল উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বেশ কয়েকটি ফসলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। আনারস উৎপাদন বেড়ে হয়েছে তিন লাখ ৬১ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন, যা আগের বছর ছিল দুই লাখ আট হাজার টন। আম উৎপাদন ১৮ লাখ ৭১ হাজার টন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ লাখ ৫২ হাজার টনে। কাঁঠাল উৎপাদন ১০ লাখ ২০ হাজার টন থেকে বেড়ে হয়েছে ১১ লাখ ১২ হাজার টনের বেশি।

এ ছাড়া ড্রাগন ফলের উৎপাদনে বড় ধরনের বৃদ্ধি হয়েছে। আগের বছর যেখানে উৎপাদন ছিল ১২ হাজার টনের কিছু বেশি, সেখানে নতুন মৌসুমে তা বেড়ে ২২ হাজার টনের বেশি হয়েছে।

পেয়ারা, বাতাবি লেবু, লেবু ও জামরুলের উৎপাদনেও কিছুটা বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।

অন্যান্য খাদ্য ও পশুখাদ্য: আলু উৎপাদন এখনো দেশের অন্যতম প্রধান কৃষি খাত। প্রতিবেদনে দেখা যায়, আগের মৌসুমে আলুর উৎপাদন ছিল এক কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টনের বেশি। এবার আলু উৎপাদনের পুরো হিসাব পাওয়া না গেলেও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া পশুখাদ্য উৎপাদনেও কিছু পরিবর্তন হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন পশুখাদ্যের আবাদ প্রায় ১২ হাজার একর থেকে বেড়ে ১৫ হাজার একরের বেশি হয়েছে।

কৃষি শ্রমিকের মজুরি : প্রতিবেদনে কৃষি শ্রমিকদের মজুরি সম্পর্কেও তথ্য দেয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে কৃষি শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি কিছুটা ওঠানামা করেছে। খাবারসহ মজুরির ক্ষেত্রে- জুলাই মাসে পুরুষ শ্রমিকের গড় মজুরি ছিল প্রায় ৫৭৭ টাকা এবং নারীর ৫৭৩ টাকা, আগস্টে তা কিছুটা কমে পুরুষের ৫৬৭ টাকা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে পুরুষ শ্রমিকের মজুরি নেমে এসেছে ৫১৩ টাকায় এবং নারীর ৩৭৪ টাকায়। খাবার ছাড়া মজুরি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে, কারণ তখন শ্রমিকদের নিজস্ব খাদ্য ব্যয় বহন করতে হয়।

সার্বিকভাবে দেখা যায়, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৫ প্রান্তিকে বাংলাদেশের কৃষি খাতে উৎপাদনের চিত্রে বৈচিত্র্য রয়েছে। খাদ্যশস্যের কিছু ক্ষেত্রে আবাদ কমলেও সবজি ও ফল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেশের কৃষি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সঙ্কেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বর্তমানে সরকার ত্রৈমাসিক জিডিপি হিসাব প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ কারণে কৃষি খাতের উৎপাদন ও অন্যান্য সূচকের তথ্যও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা জরুরি হয়ে উঠেছে। কৃষি পরিসংখ্যানের নিয়মিত প্রকাশনার মূল উদ্দেশ্য হলো নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং কৃষি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সময়োপযোগী তথ্য সরবরাহ করা। বিবিএসের কৃষি শাখা মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে এবং পরে তা বিশ্লেষণ করে কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষপুস্তকসহ বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ করে থাকে। এসব তথ্য কৃষি নীতি প্রণয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং উৎপাদন প্রবণতা বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে মোট ছয়টি প্রধান ফসল এবং প্রায় ১৪০টি গৌণ ফসলের আবাদ ও উৎপাদন নিয়মিত পরিমাপ করা হয়। প্রতিটি মৌসুম শেষে মাঠ পর্যায়ে উৎপাদন ও ফলনের জরিপ পরিচালনা করা হয়।