সার্ক কৃষিকেন্দ্রের আঞ্চলিক প্রশিক্ষণে বিশেষজ্ঞরা
জলবায়ুর পরিবর্তনে মারাত্মক ঝুঁকিতে দ: এশিয়ার কৃষি
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিব্যবস্থাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ঘন ঘন বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও তাপমাত্রা বাড়ার কারণে উৎপাদন যেমন হুমকিতে পড়ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষকের জীবিকা। এই প্রেক্ষাপটে কৃষিকে জলবায়ু-সহিষ্ণু ও টেকসই করতে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থাপনা হিসেবে কার্বন ট্রেডিংয়ের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা জোরদার হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সার্ক কৃষিকেন্দ্রের (এসএসি) উদ্যোগে গতকাল ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ‘দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি খাতে কার্বন ট্রেডিংয়ের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’।
এসএসি আয়োজিত এই প্রশিক্ষণে সার্কভুক্ত দেশগুলোসহ বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক, গবেষক, উন্নয়নকর্মী ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। কর্মসূচিতে কৃষি খাতে টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমে কার্বন ট্রেডিং কিভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও মতবিনিময় করা হচ্ছে।
উদ্বোধনী অধিবেশনে স্বাগত ও সূচনা বক্তব্যে সার্ক কৃষিকেন্দ্রের পরিচালক ড. মো: হারুনুর রশিদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি খাত দিন দিন আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই অবস্থায় কৃষকদের সহায়তা দিতে নতুন ও উদ্ভাবনী আর্থিক ব্যবস্থাপনা জরুরি। সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা গেলে কার্বন ট্রেডিং কৃষিতে জলবায়ুবান্ধব চর্চা বিস্তারে সহায়ক হতে পারে এবং একই সাথে গ্রামীণ জীবিকা উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।
তিনি সার্ক কাঠামোর আওতায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে সদস্য দেশগুলো ন্যায্য সুযোগ পায় এবং অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ভাগাভাগি করা সম্ভব হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো: আবদুস সালাম বলেন, কৃষি খাতে কার্বন হিসাব নিরূপণের জন্য নির্ভরযোগ্য ও বৈজ্ঞানিক তথ্য তৈরিতে শক্তিশালী গবেষণা সহায়তা অপরিহার্য। কার্বন ট্রেডিং উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং এটি যেন খাদ্য নিরাপত্তার সাথে সাংঘর্ষিক না হয়ে বরং পরিপূরক হিসেবে কাজ করে, সে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। একই সাথে প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে এসব উদ্যোগকে বাস্তবসম্মত ও ন্যায্য করার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সার্ক সচিবালয়ের পরিচালক (এআরডি ও এসডিএফ) তানভীর আহমদ তোরোফদার বলেন, আঞ্চলিক পর্যায়ে নীতিগত সমন্বয় ছাড়া কৃষি খাতে কার্বন ট্রেডিং কার্যকর করা কঠিন। সমন্বিত মানদণ্ড প্রণয়ন, জ্ঞানবিনিময় এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য কার্বন ট্রেডিং সহজলভ্য করা সম্ভব হবে। একই সাথে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সংলাপ সহজ করতে সার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভারতের ভরাহা প্রতিষ্ঠানের লিড পার্টনারশিপ অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক অ্যালায়েন্স কৌশল বিস্ত। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিতে কার্বন ট্রেডিংয়ের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরেন। সেই সাথে বৈশ্বিক স্বেচ্ছাসেবী ও বাধ্যতামূলক কার্বন বাজারের প্রবণতা এবং ক্ষুদ্র কৃষিভিত্তিক ব্যবস্থায় এর প্রাসঙ্গিকতা উঠে আসে।
তিনি বলেন, উন্নত মাটি ব্যবস্থাপনা, আগরোফরেস্ট্রি এবং কৃষি খাতে মিথেন নিঃসরণ কমানোর মতো চর্চার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
প্রশিক্ষণের লক্ষ্য ও সামগ্রিক কাঠামো তুলে ধরেন এসএসির সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (এনআরএম) ও প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী ড. রাজা উল্লাহ খান। তিনি জানান, এই প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো কার্বন বাজার সম্পর্কে কারিগরি জ্ঞান বৃদ্ধি, কৃষিভিত্তিক কার্বন ক্রেডিটের সম্ভাবনা অনুসন্ধান এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা। সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে কৃষি খাত দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হতে পারে। কৃষি শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ভুক্তভোগী নয়, বরং কার্বন শোষণ ও নিঃসরণ হ্রাসের মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তোলার কার্যকর সমাধানের অংশ হতে পারে।